বাংলার ‘ধানের গোলা’ বর্ধমান

মিশন জিওগ্রাফি ইন্ডিয়া: ভারতবর্ষের কৃষিজ ফসলের মধ্যে ধান, গম, পাট প্রভৃতি গুরুত্বপূর্ণ। সারা দেশে ধান উৎপাদনে পশ্চিমবঙ্গ প্রথম, উত্তরপ্রদেশ দ্বিতীয় ও অন্ধ্রপ্রদেশ তৃতীয় স্থান অধিকার করে। পশ্চিমবঙ্গ মোট ধান উৎপাদনের ১৪.২৪% উৎপাদন করে থাকে। এখানে বার্ষিক ধান উৎপাদনের পরিমাণ প্রায় ১৪৮.৫৩ লক্ষ টন।
তবে পশ্চিমবঙ্গের সর্বত্র সমান পরিমাণে ধান উৎপাদন হয়না। জেলা হিসেবে বর্ধমানে সর্বাধিক পরিমাণ ধান চাষ হয় বলে, একে পশ্চিমবঙ্গের ‘ধানের গোলা’ বলা হয়। বর্ধমানের ভৌগোলিক ক্ষেত্র ৭,০০,১০০ হেক্টর, যার মধ্যে কৃষিযোগ্য ভূমি (রোপণ ভূমি ও ফলের বাগান সমেত) ৪,৫৫,৩৯০ হেক্টর। অর্থাৎ ৩৩ টি ব্লক নিয়ে গঠিত এই জেলার প্রায় ৬০.০৩৩% আয়তন কৃষিযোগ্য ভূমি হিসেবে পরিগণিত।
কিন্তু ৭ এপ্রিল, ২০১৭ তে পশ্চিমবঙ্গের বর্তমান মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের তত্ত্বাবধানে বর্ধমান জেলাটি দ্বিবিভক্ত হয় এবং নবীনতম জেলা হিসেবে পশ্চিম বর্ধমান আত্মপ্রকাশ করে। মূলত খনি শিল্পাঞ্চল নিয়ে পশ্চিম বর্ধমান এবং কৃষি অঞ্চল নিয়ে পূর্ব বর্ধমান গঠিত হয়। তাই আক্ষরিক অর্থে বর্তমানে ‘ধানের গোলা’ পূর্ব বর্ধমান।
ভূ-প্রকৃতিগত দিক থেকে পূর্ব বর্ধমান রাঢ় সমভূমি অঞ্চলের অন্তর্গত। একে তিনটি ভাগে ভাগ করা যায় — (১) উত্তরের, কাঁকসা – কেতুগ্রাম সমভূমি — যা অজয় নদের অববাহিকা অঞ্চলে অবস্থিত (২) মধ্যাংশের, বর্ধমান সমভূমি অঞ্চল (৩) দক্ষিণের, খন্ডঘোষ সমভূমি অঞ্চল, যা দামোদর নদের অববাহিকা অঞ্চলে অবস্থিত।
প্রশাসনিক দিক থেকে পূর্ব বর্ধমান চারটি মহকুমায় বিভক্ত — (১) বর্ধমান সদর উত্তর — ৭ টি ব্লক (আউশগ্রাম ১, আউশগ্রাম ২, ভাতার, গলসি ১, গলসি ২, বর্ধমান ১, বর্ধমান ২) নিয়ে গঠিত। (২) বর্ধমান সদর দক্ষিণ — ৬ টি ব্লক (মেমারি ১, মেমারি ২, জামালপুর, রায়না ১, রায়না ২, খন্ডঘোষ) নিয়ে গঠিত। (৩) কালনা — ৫ টি ব্লক (পূর্বস্থলী ১, পূর্বস্থলী ২, কালনা ১, কালনা ২, মন্তেশ্বর) নিয়ে গঠিত। (৪) কাটোয়া — ৫ টি ব্লক (মঙ্গলকোট, কাটোয়া ১, কাটোয়া ২, কেতুগ্রাম ১, কেতুগ্রাম ২) নিয়ে গঠিত।
প্রধান কৃষিজ ফসল ধান উৎপাদনের ক্ষেত্রে প্রতিটি মহকুমাই গুরুত্বপূর্ণ। তবে ধানচাষের জন্য যেসব অনুকূল পরিবেশ পূর্ব বর্ধমানে রয়েছে, সেগুলি হল –
(১) বৃষ্টিপাতঃ- ধানচাষের প্রথম পর্যায়ে ১০০-২০০ সেমি বৃষ্টিপাতের প্রয়োজন হয় এবং মৌসুমি জলবায়ুর প্রভাবে বর্ষাকালে এই অঞ্চলে প্রচুর বৃষ্টিপাত হয়।
(২) তাপমাত্রাঃ- পূর্ব বর্ধমানে গড় তাপমাত্রা ২৫-৩০ ডিগ্রি সেলসিয়াস, যা ধান চাষের জন্য আদর্শ।
(৩) জমির প্রকৃতিঃ- যেহেতু গাছের গোড়ায় জল জমে থাকা ধানগাছের বৃদ্ধিতে সহায়ক, তাই পূর্ব বর্ধমানের নিচু সমতল ভূমিতে ব্যাপক ধানচাষ হয়।
(৪) মৃত্তিকাঃ- অজয় ও দামোদর নদ বাহিত উর্বর পলিযুক্ত দোঁয়াশ মৃত্তিকা পূর্ব বর্ধমানে ধান উৎপাদনে আদর্শ পরিবেশ গড়ে তুলেছে।
(৫) জলের জোগানঃ- বিশেষত বোরো ধানের চাষের ক্ষেত্রে সেচের জন্য অজয় ও দামোদর নদের জল ব্যবহৃত হয়।

এছাড়াও সুলভ ও দক্ষ পরিশ্রমী শ্রমিক, মূলধন, আধুনিক কৃষি যন্ত্রপাতির ব্যবহার, কীটনাশক ও সারের যথাযথ প্রয়োগের মাধ্যমে পূর্ব বর্ধমানে ব্যাপক ভাবে ধানচাষ হয়।
এই জেলায় বার্ষিক ধান উৎপাদনের পরিমাণ ১৮,৯৭,০৩০ টন। এর মধ্যে বর্ধমান সদর উত্তর মহকুমাতে উৎপাদন সবচেয়ে বেশি, বার্ষিক ধান উৎপাদন ৬,৮৮,৬২৬ টন। এই মহকুমার ভাতার ব্লকে ২,৫২,৯৯৭ টন, বর্ধমান ১ ব্লকে ১,৫৯,৬৪৯ টন এবং গলসি ২ ব্লকে ১,০০,৫৭৭ টন বার্ষিক ধান উৎপাদিত হয়। দ্বিতীয় স্থানে রয়েছে কাটোয়া মহকুমা, যেখানে বার্ষিক ধান উৎপাদন ৫,০৯,৬১০ টন। এর অন্তর্গত সর্বাধিক ধান উৎপাদক ব্লকগুলি হল — মঙ্গলকোট (১,৯৬,৭৬০ টন), কাটোয়া ২ (১,৪৪,৫৫৫ টন), কেতুগ্রাম ১ (৭০,০২০ টন)। বর্ধমান সদর দক্ষিণ মহকুমায় বার্ষিক ধান উৎপাদন ৪,৪১,৬৪৫ টন। এর অন্তর্গত রায়না ১, মেমারি ২ ও খন্ডঘোষ ব্লকে বার্ষিক ধান উৎপাদনের পরিমাণ যথাক্রমে ১,৫৫,৯৮৭ টন, ১,৩৬,৭৬০ টন ও ৮৭,০৭৯ টন। বার্ষিক ২,৫৭,১৪৯ টন ধান উৎপন্ন হয় কালনা মহকুমায়। এর মধ্যে মন্তেশ্বরে ব্লকে ৯৫,৬৪১ টন, কালনা ১ ব্লকে ৫৭,১৫১ টন, পূর্বস্থলী ১ ব্লকে ৫১,৬৬১ টন বার্ষিক ধান উৎপাদিত হয়।
সময়ের নিরিখে আউশ, আমন, বোরো — এই ৩ প্রকার ধানের চাষই লক্ষ্য করা যায় এই জেলাতে। তবে, আমন ধান (যা বর্ষার শুরুতে অর্থাৎ জুন-জুলাই মাসে বপন করা হয় ও অক্টোবর-নভেম্বর মাসে কাটা হয়) এর উৎপাদন সর্বাধিক। বোরো ধান অর্থাৎ শীতকালীন ধান যা প্রধানত সেচনির্ভর, উৎপাদনের ক্ষেত্রে দ্বিতীয় স্থান অধিকার করে। এই ধান নভেম্বর-ডিসেম্বরে রোপণ করে, ফেব্রুয়ারি-মার্চে তোলা হয়। আউশ ধান অর্থাৎ যা মার্চ-এপ্রিলে রোপণ করে মে-জুন মাসে কাটা হয়, এর উৎপাদন সবচেয়ে কম। গ্রীষ্মকালীন এই ধান চাষের প্রধান সমস্যা জলের সমবন্টনের অভাব। তবে উর্বব মৃত্তিকা হওয়ায়, বেশিরভাগ জমিই দো-ফসলি বা বহুফসলি অর্থাৎ একই জমিতে দুই বা তিনপ্রকার ধানেরই চাষ হয়ে থাকে।
এই জেলাতে বিভিন্ন উচ্চ ফলনশীলের ধানের উৎপাদন লক্ষ্য করা যায়। এর মধ্যে সোনাম, বাঁশকাঠি, নানারকম মিনিকিট, রত্না, জয়া, আদিত্য ইত্যাদি এমনকি লালস্বর্ণের চাষও হয়ে থাকে। বর্তমানে জি.আই. স্বীকৃত পেল পূর্ব বর্ধমানের সুগন্ধি গোবিন্দভোগ ধান।
সাধারনত দুই পদ্ধতিতে ধানচাষ হয়ে থাকে। রোপণ পদ্ধতিতে অল্প খানিকটা জমিতে ধানের বীজ ছড়িয়ে প্রথমে বীজতলা করা হয়। ১৫-২০ দিন পর বীজতলা থেকে চারা তুলে এনে মূল জমিতে সারিবদ্ধভাবে সমদূরত্বে রোপণ করা হয়। অন্যদিকে বপন পদ্ধতিতে আগে থেকে তৈরি করা জমিতে বীজ ছড়িয়ে দেওয়া হয়, এবং সেখানেই চারা ও গাছ উৎপন্ন হয়। পূর্ব বর্ধমান জেলাতে রোপণ পদ্ধতিতে বেশিরভাগ ধান উৎপন্ন হয়।
শুধুমাত্র ধান উৎপাদনের ক্ষেত্রে নয়, ধানের ওপর ভিত্তি করে কৃষিভিত্তিক শিল্প রূপে রাইস মিল গড়ে উঠেছে। পরিসংখ্যান অনুসারে, এই জেলাতে ২০০ টির বেশি রাইস মিল রয়েছে। যেমন — লক্ষ্মীনারায়ণ রাইস মিল, রামকৃষ্ণ রাইস মিল প্রভৃতি। এগুলি প্রধানত জমির কাছাকাছি স্থানে গড়ে ওঠে যা কর্মসংস্থানে উল্লেখযোগ্য ভূমিকা নেয়।
কিন্তু জলবায়ু প্রতিকূলতা, জলের অভাব, নিম্ন বাজারদরের কারনে এই জেলার ধানচাষীরা বর্তমানে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন এবং কৃষক আত্মহত্যার ঘটনাও ঘটছে।
সমস্যা সমাধানে পশ্চিমবঙ্গ সরকার কর্তৃক গৃহীত কর্মসূচী “আমার ফসল, আমার গোলা” প্রান্তিক চাষীদের আর্থিক সহায়তা প্রদান করে চলেছে। ফসলের গোলা তৈরির জন্য সরকারি ভর্তুকির পরিমাণ ৫০০০-২৫০০০ টাকা। এছাড়াও কৃষকদের কিষাণ ক্রেডিট কার্ড ও ব্যাঙ্ক অ্যাকাউন্ট পশ্চিমবঙ্গ সরকার এই প্রকল্পের মাধ্যমে করে দিচ্ছে।

লেখিকাঃ- সূচনা ব্যানার্জী (ভূগোলিকা-Bhugolika)।
তথ্য সহায়তা ও টাইপিংঃ- অরিজিৎ সিংহ মহাপাত্র।
তথ্যসূত্রঃ- Wikipedia, ভারত ও পশ্চিমবঙ্গের ভূগোল – কার্তিকচন্দ্র মন্ডল, বর্ধমান সহায়িকা ২০১৬-১৭, District Statistical Handbook 2014 Burdwan.
প্রথম প্রকাশ: ‘ভূগোলিকা’ ফেসবুক পেজ, প্রথম বর্ষপূর্তি-৩০/০৩/২০১৮

 ©Copyright Mission Geography India. 

এখান থেকে শেয়ার করুন
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  

Leave a Reply

Leave a Reply

error: মিশন জিওগ্রাফি ইন্ডিয়া কর্তৃক সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত