ভারতের জীববৈচিত্র্য হেরিটেজ সাইট

ভারতের জীববৈচিত্র্য হেরিটেজ সাইট

২০০২ সালে ভারতে জীববৈচিত্র্য আইন পাশ হওয়ার পর ২০০৩ সালের ১ লা অক্টোবর ভারত সরকারের পরিবেশ ও বন মন্ত্রকের অধীনে এক স্বশাসিত সংস্থা ‘জাতীয় জীববৈচিত্র্য কর্তৃপক্ষ’ (National Biodiversity Authority -NBA) গঠিত হয়। এই সংস্থাটি কেন্দ্রীয় সরকারকে জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণ, জীবজ সম্পদের সঠিক ও স্থিতিশীল ব্যবহার প্রভৃতি বিষয়ে পরামর্শ প্রদান ও কর্ম সম্পাদন করে থাকে এবং ভারতের রাজ্য সরকারগুলিকে রাজ্যের অন্তর্গত গুরুত্বপূর্ণ জীববৈচিত্র্যযুক্ত স্থানগুলিকে হেরিটেজ সাইট হিসেবে সংরক্ষণের পরামর্শ দিয়ে থাকে। মূলত এই সংস্থার পরামর্শ, সুপারিশের ভিত্তিতে National Biodiversity Authority প্রদত্ত গাইডলাইন অনুসারে রাজ্য সরকারগুলি নিজ নিজ রাজ্যে জীববৈচিত্র্য হেরিটেজ সাইট গড়ে তোলে।

ভারতের জীববৈচিত্র্য হেরিটেজ সাইট
ভারতের জীববৈচিত্র্য হেরিটেজ সাইট

আসুন এবার দেখা যাক জীববৈচিত্র্য হেরিটেজ সাইট (Biodiversity Heritage Site – BHS) কি —

জীববৈচিত্র্য হেরিটেজ সাইটঃ-
National Biodiversity Authority প্রদত্ত সংজ্ঞা অনুসারে —

“জীববৈচিত্র্য হেরিটেজ সাইট হল সেই অনন্য, সহজেই ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে এরূপ বাস্তুতন্ত্র অঞ্চলগুলি যা জীববৈচিত্র্যে ভরপুর স্থলজ, উপকূলীয়, অভ্যন্তরস্থ জলাভূমি বা সামুদ্রিক অঞ্চল যেখানে নিম্নোক্ত এক বা একাধিক উপাদান রয়েছে : বন্য ও গৃহপালিত প্রজাতির ভরপুর উপস্থিতি বা ইনট্রা-স্পেসিফিক ক্যাটাগরি, অধিকহারে প্রজাতি স্থানিকতা, বিরল ও বিপন্ন প্রজাতির উপস্থিতি, কিস্টোন প্রজাতি, অভিব্যক্তিমূলক গুরুত্বযুক্ত প্রজাতি, গৃহপালিত/উৎপাদিত প্রজাতির বন্য পূর্বসূরি প্রজাতি, জীবাশ্ম দ্বারা অতীতের প্রাক-সহত্ত্ব জীবজ উপাদানের উপস্থাপন এবং বিশেষ ভাবে সাংস্কৃতিক, নৈতিক, নান্দনিক মূল্যযুক্ত এবং দীর্ঘ মানব ইতিহাসের সাথে সম্পর্কিত হয়ে বা না হয়ে সাংস্কৃতিক বৈচিত্র্য রক্ষনাবেক্ষনে গুরুত্বপূর্ণ”।

জীববৈচিত্র্য আইন ২০০২ এর ৩৭ ধারা অনুসারে — কোনো রাজ্য সরকার স্থানীয় কর্তৃপক্ষের সাথে আলোচনাক্রমে কোনো স্থান/অঞ্চলকে জীববৈচিত্র্য হেরিটেজ সাইট (BHS) রূপে ঘোষণা করতে পারে। জীববৈচিত্র্য আইন ২০০২ এর ৩৭ ধারার ২ নং উপধারা অনুসারে — কোনো রাজ্য সরকার কেন্দ্রীয় সরকারের সাথে আলোচনাক্রমে জীববৈচিত্র্য হেরিটেজ সাইট (BHS) এর সংরক্ষণ ও ব্যবস্থাপনার রূপরেখা তৈরি করতে পারে।

জীববৈচিত্র্য আইন ২০০২ এর ৩৭ ধারার ৩ নং উপধারা অনুসারে — কোনো রাজ্য সরকার জীববৈচিত্র্য হেরিটেজ সাইট সংরক্ষণের জন্য আর্থিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত কোনো ব্যক্তি/জনগোষ্ঠীর জন্য ক্ষতিপূরণ বা পুনর্বাসন স্কিম প্রদান করতে পারে।

বর্তমানে ভারতে National Biodiversity Authority (NBA) স্বীকৃত ১২ টি জীববৈচিত্র্য হেরিটেজ সাইট (BHS) রয়েছে। আসুন দেখা যাক একনজরে এই ১২ টি জীববৈচিত্র্য হেরিটেজ সাইট –

(১) নাল্লুর ট্যামারিন্ড গ্রোভঃ- এটি কর্ণাটক রাজ্যের বেঙ্গালুরু জেলার দেবনাহাল্লি তালুকে অবস্থিত। আয়তন ২১.৮৫ হেক্টর। ২০০৭ সালে এটি ভারতের সর্বপ্রথম জীববৈচিত্র্য হেরিটেজ সাইট রূপে ঘোষিত হয়। এখানে চোল সাম্রাজ্যের সমকালীন ৩০০+ তেঁতুল গাছ রয়েছে।

(২) হোগরেকানঃ- এটি কর্ণাটক রাজ্যের চিকমাগালুর জেলার কাদুর তালুকে অবস্থিত। আয়তন ১০১৫.০৪ হেক্টর। ২০১০ সালে এটি জীববৈচিত্র্য হেরিটেজ সাইট রূপে ঘোষিত হয়। এখানে শোলা বনভূমি ও তৃণভূমি দেখা যায়। প্রচুর স্থানিক ও ঔষধিগুণযুক্ত উদ্ভিদ রয়েছে। এটি কুদ্রেমুখ ও ভদ্রার অভয়ারণ্যের মধ্যে ‘Wildlife Corridor’ হিসেবে কাজ করে।

(৩) জি.কে.ভি.কে. ক্যাম্পাসঃ- এটি কর্ণাটক রাজ্যের বেঙ্গালুরু জেলার জি.কে.ভি.কে. ক্যাম্পাস (University of Agricultural Sciences) -এ অবস্থিত। আয়তন ১৬৭ হেক্টর। ২০১০ সালে এটি জীববৈচিত্র্য হেরিটেজ সাইট রূপে ঘোষিত হয়। এখানে ১৩ প্রজাতির স্তন্যপায়ী, ১০ প্রজাতির সরীসৃপ, ১৬৫ প্রজাতির পাখি ও ৫৩০ প্রজাতির উদ্ভিদ রয়েছে।

(৪) অম্বরগুডাঃ- এটি কর্ণাটক রাজ্যের শিমোগা জেলাতে অবস্থিত। আয়তন ৩৮৫৭.১২ হেক্টর। ২০১১ সালে এটি জীববৈচিত্র্য হেরিটেজ সাইট রূপে ঘোষিত হয়। এটি শরাবতী ও সোমেশ্বর অভয়ারণ্যের মধ্যে অবস্থিত। এখানে শোলা বনভূমি ও তৃণভূমি রয়েছে।

(৫) আল্লাপাল্লিঃ- এটি মহারাষ্ট্র রাজ্যের গড়চিরোলি জেলাতে অবস্থিত। আয়তন ৬ হেক্টর। ২০১৪ সালে এটি জীববৈচিত্র্য হেরিটেজ সাইট রূপে ঘোষিত হয়। এখানে সংরক্ষিত অরণ্যটির নৈতিক, ঐতিহাসিক ও জৈবিক গুরুত্ব রয়েছে। এই অরণ্যে সেগুন, কুসুম, তেন্দু প্রভৃতি নানা প্রজাতির বৃক্ষ এবং গুঞ্জ, টারোটা প্রভৃতি ঔষধি গাছগাছড়া রয়েছে।

(৬) টোংলুঃ- এটি পশ্চিমবঙ্গ রাজ্যের দার্জিলিং জেলার সিংগলিলা জাতীয় উদ্যানে অবস্থিত। এটি সিংগলিলা শৈলশিরার একটি অংশ। আয়তন ২৩০ হেক্টর। ২০১৫ সালে এটি জীববৈচিত্র্য হেরিটেজ সাইট রূপে ঘোষিত হয়। এখানে নানাপ্রকার ঔষধিগুণযুক্ত উদ্ভিদ প্রজাতি সংরক্ষিত রয়েছে।

(৭) ধোত্রেঃ- এটি পশ্চিমবঙ্গ রাজ্যের দার্জিলিং জেলাতে অবস্থিত। এটি সিংগলিলা জাতীয় উদ্যানের বাফার জোনে অবস্থিত। আয়তন ১৮০ হেক্টর। ২০১৫ সালে এটি জীববৈচিত্র্য হেরিটেজ সাইট রূপে ঘোষিত হয়। এখানে নানাপ্রকার ঔষধিগুণযুক্ত উদ্ভিদ প্রজাতি সংরক্ষিত রয়েছে।

(৮) আমিনপুর হ্রদঃ- এটি তেলেঙ্গানা রাজ্যের সংগারেড্ডি জেলাতে অবস্থিত। এটি হায়দ্রাবাদ শহরের উপকন্ঠে অবস্থিত। আয়তন ৩৭.৬৩ হেক্টর। ২০১৬ সালে এটি জীববৈচিত্র্য হেরিটেজ সাইট রূপে ঘোষিত হয়। এটি ভারতের প্রথম পৌর অঞ্চলের অন্তর্গত জীববৈচিত্র্য হেরিটেজ সাইট এবং ভারতের প্রথম জলাশয় জীববৈচিত্র্য হেরিটেজ সাইট। এখানে ১৮০+ প্রজাতি রয়েছে এবং পরিযায়ী পাখির উপস্থিতি বিশেষ লক্ষ্যনীয়।

(৯) ঘড়িয়াল রিহ্যাব সেন্টারঃ- এটি উত্তরপ্রদেশ রাজ্যের লখনউ জেলাতে কুকরাইল রিজার্ভ ফরেস্টে অবস্থিত। আয়তন ১০ হেক্টর। ২০১৬ সালে এটি জীববৈচিত্র্য হেরিটেজ সাইট রূপে ঘোষিত হয়। এখানে বিপন্ন প্রজাতির ঘড়িয়ালের সংরক্ষণ ও পুনর্বাসন ব্যবস্থা রয়েছে।

(১০) ডায়ালংঃ- এটি মণিপুর রাজ্যের তামেঙ্গলং জেলাতে অবস্থিত। আয়তন ১১.৩৫ বর্গকিমি। ২০১৭ সালে এটি জীববৈচিত্র্য হেরিটেজ সাইট রূপে ঘোষিত হয়। এখানে পাহাড়ি অঞ্চলের জঙ্গলে নানা প্রজাতির উদ্ভিদ ও প্রাণী দেখা যায় এবং উপজাতি সাংস্কৃতিক অঞ্চল হিসেবে গুরুত্বপূর্ণ।

(১১) মাজুলিঃ- এটি আসাম রাজ্যের মাজুলি দ্বীপ জেলাতে অবস্থিত। আয়তন ৮৭৫ বর্গকিমি। ২০১৭ সালে এটি জীববৈচিত্র্য হেরিটেজ সাইট রূপে ঘোষিত হয়। এখানে ব্রহ্মপুত্র নদ ও মাজুলি দ্বীপের সমাহারে গঠিত বাস্তুতান্ত্রিক ও সাংস্কৃতিক গুরুত্ব সংরক্ষণ করা হয়েছে।

(১২) চিলকিগড়ঃ- এটি পশ্চিমবঙ্গ রাজ্যের ঝাড়গ্রাম জেলার চিলকিগড়ে অবস্থিত। আয়তন ২২.৬২ হেক্টর। ২০১৮ সালে এটি জীববৈচিত্র্য হেরিটেজ সাইট রূপে ঘোষিত হয়। এখানে চিলকিগড় কনকদুর্গার জঙ্গলে শাল, কুচিলা, কদম্ব প্রভৃতি উদ্ভিদ ও নানাপ্রকার পাখি, বনপ্রাণী, প্রজাপতির ভরপুর জীববৈচিত্র্য ও সাংস্কৃতিক গুরুত্ব রয়েছে।

লেখকঃ- অরিজিৎ সিংহ মহাপাত্র (পার্শ্বলা, বাঁকুড়া)।

তথ্যসূত্রঃ- National Biodiversity Authority ; Biodiversity Act ২০০২ ; আনন্দবাজার পত্রিকা ; এই সময় ; ইম্ফল টাইমস ; মহারাষ্ট্র ট্যুরিজম ; তেলেঙ্গানা জীববৈচিত্র্য পর্ষদ।

©মিশন জিওগ্রাফি ইন্ডিয়া।

এখান থেকে শেয়ার করুন
  • 249
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
    249
    Shares

Leave a Reply

মন্তব্য করুন

error: মিশন জিওগ্রাফি ইন্ডিয়া কর্তৃক সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত