পানীয়জল এবং পশ্চিমবঙ্গ

মিশন জিওগ্রাফি ইন্ডিয়া: আধুনিক মানবসভ্যতার ক্রমজটিল ভবিষ্যতে অন্যতম মহার্ঘ্য বস্তু হতে চলেছে — জল, বিশেষত পানীয়জল। সম্প্রতি রাজ্যজুড়ে আন্তর্জাতিক জল দিবস পালিত হল। সারা দেশের মধ্যে পানীয়জল থেকে বঞ্চিত মানুষের সংখ্যায় পশ্চিমবঙ্গ দ্বিতীয়। শুধুমাত্র ‘মরুভূমির দেশ’ রাজস্থান এগিয়ে। এরসাথে রয়েছে পশ্চিমবঙ্গের একটা বিস্তীর্ণ অঞ্চল জুড়ে পানীয়জলে আর্সেনিক ও ফ্লোরাইড দূষণ। এমত পরিস্থিতিতে আসুন দেখা যাক, পশ্চিমবঙ্গ সরকার পানীয়জল বিষয়ে কিকি উদ্যোগ নিয়েছে এবং নিতে চলেছে।

পশ্চিমবঙ্গ সরকার জানাচ্ছে সবার জন্য জল সরবরাহে বদ্ধপরিকর সরকার। পানীয় জল যাতে এই রাজ্যের সমস্ত প্রান্তে সুলভে পাওয়া যায় তার জন্য রাজ্য সরকার প্রচুর প্রকল্প শুরু করেছে। জনস্বাস্থ্য কারিগরি দপ্তরের ভারপ্রাপ্ত মন্ত্রী শ্রী সুব্রত মুখোপাধ্যায় তার দপ্তরের ২০১৮-১৯ সালের বাজেটে পানীয় জল উৎপন্ন করা, তা সংরক্ষণ করা এবং সঠিক ভাবে বন্টন করার জন্য নেওয়া বিভিন্ন পদক্ষেপের বিবরণ দিয়েছেন —

★ভিশন ২০২০: ২০২০ সালের মধ্যে রাজ্যের গ্রামীণ অঞ্চলে প্রত্যেক মানুষ যাতে প্রতিদিন ৭০ লিটার পানীয় জল পেতে পারে তার জন্যে রাজ্য সরকার ‘ভিশন ২০২০’ নামে একটি পরিকল্পনা শুরু করেছে। এই পরিকল্পনা অনুযায়ী প্রত্যেক বাড়ীতে পাইপ দিয়ে পানীয় জল সরবরাহ করার কাজকে অগ্রাধিকার দেওয়া হয়েছে।

★গ্রামীণ জল সরবরাহ কার্যক্রম: ২০১৭-১৮ অর্থবর্ষে গ্রামীণ জল সরবরাহ কার্যক্রম অনুযায়ী ২৪১১ টি শুষ্ক এলাকা, ৬১০ টি গুনগত ভাবে নিম্নমানের জলীয় এলাকায়, ৬০০ টি বিদ্যালয়ে এবং ২৯১ অঙ্গনওয়াড়ি কেন্দ্রে স্থায়ী পানীয় জলের ব্যবস্থা করে হয়েছে।

★পাইপ-জাত জল সরবরাহ ব্যবস্থা: ২০১৭-১৮ অর্থবর্ষে ১১৪ টি পাইপ-জাত জল সরবরাহ পরিকাঠামো মোট ১৪৫১.৬০ কোটি টাকা খরচ করে তৈরী করা হয়েছে। এ ছাড়া ২০১৮-১৯ অর্থবর্ষে, প্রায় ২৫ লক্ষ রাজ্যবাসীর সুবিধার্থে ১০০৭.৪২ কোটি টাকা খরচ করে ৯৭ টি পাইপ-জাত জল সরবরাহ পরিকাঠামো তৈরী করা হবে। এর ফলে প্রায় ৫৬% গ্রামীণ এলাকায় পাইপ-জাত জল সরবরাহ পরিকাঠামো উপলব্ধ করা যাবে।

★আর্সেনিক প্রভাবিত এলাকায় জল সরবরাহ ব্যবস্থার মাস্টার প্ল্যান: এখনও পর্যন্ত রাজ্য সরকার মোট ১৫৭ লক্ষ গ্রামীণ জনজাতির জন্য আর্সেনিক-মুক্ত পানীয় জলের ব্যবস্থা করতে পেরেছে যা কিনা মোট আর্সেনিক প্রভাবিত এলাকার প্রায় ৯৫%। ২০১৯ সালের মার্চ মাসের মধ্যে রাজ্যের প্রত্যেক প্রান্তে আর্সেনিক-মুক্ত পানীয় জল পৌঁছে দেওয়া হবে।

২০১৮ সালের জুন মাসের মধ্যে হাবড়া- গাইঘাটা জল সরবরাহ পরিকল্পত ব্যবস্থার কাজ শুরু হয়ে যাবে, যা কিনা ৩২৭ টি মৌজার প্রায় ১৮ লাখ মানুষের উপকারে আসবে।

৩৩৮ টি পাইপ-জাত জল সরবরাহ পরিকাঠামোর মধ্যে ৩২৯-টির কাজ শুরু হয়ে গেছে। এই প্রকল্পের মাধ্যমে স্থানীয় প্রযুক্তির সাহাজ্য নিয়ে ১৬৫ টি আর্সেনিক নিষ্কাশন কেন্দ্র স্থাপন করা হয়েছে।

জনস্বাস্থ্য কারিগরি দপ্তর ৩৮৫ টি জল পরিশোধন কেন্দ্র, ৫৮ টি আর্সেনিক ও লোহা নিষ্কাশন কেন্দ্র এবং ১৩৮ টি বিদ্যালয়ে পানীয় জলের এটিএম আগামী জুন মাসের মধ্যে স্থাপন করবে। এক একটি পানীয় জলের এটিএম থেকে প্রতিবারে ১ লিটার করে জল পাওয়া যাবে।

★ফ্লোরাইড কবলিত এলাকায় পানীয় জল সরবরাহের জন্য অ্যাকশন প্ল্যান: বীরভূম, বাঁকুড়া, উত্তর দিনাজপুর, দক্ষিণ দিনাজপুর, পুরুলিয়া, মালদা ও দক্ষিণ ২৪ পরগণার ৪৩টি ফ্লোরাইড কবলিত ব্লকে ধাপে ধাপে পানীয় জল সরবরাহের জন্য একটি বিস্তারিত অ্যাকশন প্ল্যান তৈরী করা হয়েছে। এই প্রকল্পে ব্যয় হবে ১৫৮০ কোটি টাকা।

এই সকল ব্লকে নদীর উপ-ভূপৃষ্ঠস্থ বা ফ্লোরাইড মুক্ত জলস্তর থেকে জল নিয়ে পাইপের মাধ্যমে সরবরাহ করার প্রকল্প ইতিমধ্যেই চালু হয়েছে। এছাড়া ফ্লোরাইড ট্রিটমেন্টের জন্য বিভিন্ন প্রযুক্তির সাহায্যও নেওয়া হচ্ছে।

দক্ষিণ দিনাজপুরের তপন এবং গঙ্গারামপুরে দুটি বড় প্রকল্প শুরু করা হয়েছে। এই প্রকল্প দুটিতে ব্যয় হচ্ছে যথাক্রমে ১৬৫.৫ কোটি ও ১৪৫.০১ কোটি টাকা। এর ফলে উপকৃত হবেন ২.৫১ লক্ষ এবং ২.৩৮ লক্ষ মানুষ।

★জল পরীক্ষাগার: ২০১৭-২০১৮ অর্থবর্ষে ২১৭ টি পরীক্ষাগারে ৫২২৬৪৮ টি নমুনা পরীক্ষা করা হয়েছে। সরকারের “অন-সাইট মোবাইল-ভিত্তিক জল পরীক্ষা ব্যবস্থায়” জলের উৎস থেকে ১১৮০০ নমুনা নিয়ে পরীক্ষা করা হয়েছে। এই পরীক্ষার ফলাফল দপ্তরের ওয়েবসাইটে প্রকাশ করা হয়েছে।

২০১৭-১৮ অর্থবর্ষে জেলাভিত্তিক সাফল্য

★বাঁকুড়াঃ- ১৪টি ফ্লোরাইড কবলিত ব্লকে ৩০.১৫ লক্ষ মানুষের জন্য একটি বিস্তারিত জল সরবরাহ প্রকল্প ইতিমধ্যেই চালু হয়েছে। এতে ব্যয় হয়েছে ১০১১.১২ কোটি টাকা। এছাড়া, পাইপের মাধ্যমে জল সরবরাহ করার ১ টি প্রকল্প নেওয়া হয়েছে। বাঁকুড়া জেলার ফেজ ২ প্রজেক্টের আওতায় রয়েছে মেজিয়া, গঙ্গাজলঘাঁটি, ইন্দপুর, তালডাংরা, জয়পুর, কোতোলপুর, পাত্রসায়র ও সোনামুখী। এই প্রকল্পের জন্য ৮৩৩.৭৯ কোটি টাকা বরাদ্দ করা হয়েছে এবং ১১.০৩ লক্ষ মানুষ এর মাধ্যমে উপকৃত হবেন।

★পুরুলিয়াঃ- এই জেলার ৯টি ব্লকে পাইপের মাধ্যমে পানীয় জল সরবরাহ প্রকল্প শুরু হয়েছে। এই প্রকল্পে উপকৃত মানুষের সংখ্যা ১৫.৩০ লক্ষ। এই প্রকল্পে ব্যয় হয়েছে ১১৭৩.১০ কোটি টাকা। এই প্রকল্পের মাধ্যমে আগামী ২০১৯ সালের মার্চ থেকে জল পাওয়া যাবে। দ্বিতীয় পর্যায়ে এই প্রকল্পে উপকৃত হবে ১১টি ব্লকের মানুষ, খরচ হবে ৪২৮৯ কোটি টাকা।

★দক্ষিণ ২৪ পরগনাঃ- কুলপি, ডায়মন্ড হারবার-১ ও ২, ফলতা, জয়নগর-২, কুলতলি, মগরাহাট-১, মন্দিরবাজার, মথুরাপুর-১ ও ২, এর মত লবণাক্ত জলের ব্লকগুলিতে ভূপৃষ্ঠস্থ জলের সরবরাহ প্রকল্প ১৩৩২.৪১ কোটি টাকা ব্যয়ে গ্রহণ করা হয়েছে। উপকৃত হবেন ৩২.৮৭ লক্ষ মানুষ। এই প্রকল্প আংশিক ভাবে ২০১৮ সালের এপ্রিল মাসে শুরু হয়ে যাবে।

★উত্তর ও দক্ষিণ ২৪ পরগনাঃ- ভূপৃষ্ঠস্থ জল সরবরাহ প্রকল্প হাতে নেওয়া হয়েছে ৬৮৬.৯৫ কোটি টাকার ব্যয়ে। এতে আর্সেনিক কবলিত অঞ্চলের (যেমন উত্তর ২৪ পরগণার হাড়োয়া, রাজারহাট ব্লক এবং দক্ষিণ ২৪ পরগণার ভাঙড়-II ব্লক) ৫.২৬ লক্ষ মানুষ উপকৃত হবেন।

★হাওড়াঃ- বালি জগাছা ভূ-পৃষ্ঠস্থ জলপ্রকল্পের কাজ (ফেজ-১) নেওয়া হয়েছে। এর জন্য বরাদ্দ করা হয়েছে ১৫০.৬৮ কোটি টাকা। এই প্রকল্প চালু হলে ৬ টি শহরের প্রায় ২.৮৬ লক্ষ মানুষ উপকৃত হবেন। (ফেজ-২) প্রকল্পের জন্য বরাদ্দ করা হয়েছে ৪৫.৮৮ কোটি টাকা। এর ফলে ডোমজুড় ব্লকের ৯৮,৭৮২ জন মানুষ উপকৃত হবেন।

★পূর্ব মেদিনীপুরঃ- এই জেলার জন্য ২টি ভূ-পৃষ্ঠস্থ জলপ্রকল্পের কাজ নেওয়া হয়েছে। এর মধ্যে একটি পাঁশকুড়া ২ ব্লকের জন্য, এতে বরাদ্দ অর্থের পরিমাণ ২৪১.৭২ কোটি টাকা। দ্বিতীয় প্রকল্পটি নেওয়া হয়েছে নন্দকুমার, চাঁদিপুর, নন্দীগ্রাম ব্লক-১ ও নন্দীগ্রাম ব্লক-২ – এইসব নোনা জলের এলাকার জন্য। এর জন্য বরাদ্দ অর্থের পরিমাণ ৮১১.৩৮ কোটি টাকা এবং এর মাধ্যমে ৭.৮২ লক্ষ মানুষ উপকৃত হবেন।

লেখকঃ- অরিজিৎ সিংহ মহাপাত্র (ভূগোলিকা-Bhugolika এবং মিশন জিওগ্রাফি ইন্ডিয়া)
তথ্যসূত্রঃ- পঃবঃ সরকার
প্রথম প্রকাশ: ‘ভূগোলিকা’ ফেসবুক পেজ, প্রথম বর্ষপূর্তি-৩০/০৩/২০১৮

©Copyright Mission Geography India. 

এখান থেকে শেয়ার করুন
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  

Leave a Reply

Leave a Reply

error: মিশন জিওগ্রাফি ইন্ডিয়া কর্তৃক সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত