বিশ্ব উষ্ণায়ন, না – বিশ্ব সতর্কবার্তা

অমরনাথ গুহায় শিব লিঙ্গ সৃষ্টি হয়নি; উপকূলীয় অঞ্চলে ঝড়ের সংখ্যা ক্রমশঃ বেড়েই চলেছে; আগামী 20 বছরের মধ্যে লুপ্ত হয়ে যাবে কলা গাছ;সামুদ্রিক জল তল প্রায় 2 সেমিঃ উঠে এসেছে; চরম সংকটে অ্যান্টার্কটিকার সিল; বিশালায়তন বরফের চাঁই ভেঙ্গে পড়ল অ্যান্টার্কটিকায়; বিগত কয়েক কয়েক দশকের উষ্ণতার রেকর্ড ভেঙ্গে দিল এই বছরের উষ্ণতা; ক্যান্সার রোগের প্রকোপ ক্রমশঃ বৃদ্ধি পাচ্ছে; কয়েক বছরের মধ্যে সমুদ্র উপকূলবর্তী অঞ্চল জলমগ্ন হওয়ার পথে ………

বর্তমান সময়কালে এরুপ শব্দবন্ধ প্রায়শই নজরে আসে যখন আমরা খবরের কাগজ, বিভিণ্ন পত্রপত্রিকা হতে নিই অথবা চোখ রাখি দূরদর্শনের সংবাদ চ্যানেল গুলিতে l কিন্তু কেনো ? কেনো এই ভয়াবহ শব্দবন্ধ বা সতর্ক বাণী ? উত্তর এক ও অদ্বিতীয় এবং তা হল বিশ্ব উষ্ণায়নl বর্তমান সময়কালে গোটা বিশ্বের কাছে এক মূর্তমান আতঙ্ক হল বিশ্ব উষ্ণায়ন l তাবড় তাবড় বিজ্ঞানীর গলায় কাঁটার মতো বিঁধে রয়েছে এই বিশ্ব উষ্ণায়ন l উন্নত, উন্নয়নশীল ও অনুন্নত দেশের মধ্যে ছাপা অস্থিরতা ঘোলা জলের মতো বিতর্কের বুদবুদে ঘুরপাক খেয়ে চলেছে l আরোপ প্রত্যারোপে সরগরম হয়ে পড়ছে বিভিণ্ন পরিবেশ কেন্দ্রীক সম্মেলন গুলি l সমস্ত দেশেই বিশ্ব উষ্ণায়নের কাছে নত মস্তক, সকলেই চায় এর কবল থেকে বিশ্ব প্রকৃতিকে মুক্ত করতে, এর জন্য প্রতিশ্রুতির বন্যাও উঠে আসছে ভুরি ভুরি কিন্তু (বেড়ালের গলায় ঘন্টা বাঁধার জন্য) কোন দেশ ই সামনে এগিয়ে আসতে পারেনা তাদের অর্থনীতির কথা চিন্তা করে l পরিকল্পনা ঝুড়ি ঝুড়ি, রূপায়নের দায়বদ্ধতা নেই কারো কাঁধে l তটস্থ জাতিপুঞ্জ, উদ্বিগ্ন বিজ্ঞানী মহল থেকে রাজনীতিবিদ, এমনকি আপনার আমার মতো সাধারণ মানুষও l কিন্তু কেন ? কী এই বিশ্ব উষ্ণায়ন ?আসুন জেনেনেওয়া যাক বিশ্ব উষ্ণায়ন সম্পর্কে কিছু কথা l

চিত্রঃ বিশ্ব উষ্ণায়ন নিয়ে একটি রূপক চিত্র

ধারণা (Concept):- এক বিংশ শতাব্দীর ভয়ঙ্করতম পরিবেশ সমস্যা হল বিশ্ব উষ্ণায়ন l বিংশ শতকের মধ্যভাগ থেকে মানবীয় সভ্যতার অগ্রগতির নিরিখে শিল্পায়ন ও বিভিণ্ন যান্ত্রিক কার্যকলাপের ফলে উদ্ভূত বিভিণ্ন গ্রীন হাউস গ্যাসের প্রভাবে ভূপৃষ্ঠ সংলগ্ন বায়ুমণ্ডল এবং সামুদ্রিক জলরাশির গড় তাপমাত্রা বৃদ্ধিই হল বিশ্ব উষ্ণায়ন l l অর্থাত্ বর্তমান সময়কালে পৃথিবী ধীরে ধীরে উষ্ম হচ্ছে একটি বৃহৎ ও দুর্বোধ্য প্রক্রিয়ার মাধ্যমে , যেখানে প্রতিনিয়ত রসদ জুগিয়ে চলেছে বিভিণ্ন ধরনের মানবীয় কার্যাবলী ও প্রাকৃতিক কিছু ঘটনা l মূলতঃ মানবীয় কার্যাবলীর একটি নগ্ন বহিঃপ্রকাশ হল বিশ্ব উষ্ণায়ন l মানবীয় সভ্যতার বহিঃপ্রকাশ ও তার সাথে সামঞ্জস্য ভাবে বর্ধিষ্ণু চাহিদা মানব প্রযুক্তি তথা বিজ্ঞানকে বাধ্য করছে নিত্যনতুন আবিষ্কারের পথ উন্মোচন করতে l আর এই আবিষ্কারের আনাচে কানাচে ছড়িয়ে রয়েছে উষ্ণায়নের রসদ lবিশ্ব পরিবেশ যে উষ্ণ হচ্ছে তা সর্বপ্রথম ব্যক্ত করেন ঊনবিংশ শতাব্দীর শেষের দিকে (1898) সুইডিশ বৈজ্ঞানিক সাভান্তে আরহেনিয়াস l তাঁর মতে ‘মানুষ যে হারে খনিজ খনিজ জালানি কে ব্যবহার করছে তাতে অদূর ভবিষ্যতে পৃথিবীর আবহাওয়া গরম হয়ে ওঠার সম্ভাবনা রয়েছে প্রচুর l’ আরহেনিয়াসের এই সতর্কীকরণ থেকেই বিশ্ব উষ্ণায়নের বিষয়টি উঠে আসে l কিন্তু সমকালীন সময়ে বিজ্ঞানী মহলে পরিবেশ সচেতনতা না থাকায় কোনরকম আলোড়ন সৃষ্টি হয়নি l এর মধ্যে আবার ক্ষমতা বিস্তারের নগ্ন প্রয়াস হিসাবে দু-দুটো ভয়ঙ্কর বিশ্বযুদ্ধের পরিণাম স্বরূপ বিশ্ব বাসি দেখলো হিরোশিমা ও নাগাসাকির করুন অবস্থা l l

চিত্রঃ বিশ্ব
উষ্ণায়ন ও উদ্ভিদ কূল

বিশ্বযুদ্ধের পরবর্তী সময়ে প্রতিটি দেশ নিজেকে আরো শক্তিশালী ও সুরক্ষিত করতে বিশ্ব জুড়ে শিল্প ক্ষেত্রে জোয়ার সৃষ্টি করলো l নুতন করে মাথাচাড়া দিয়ে উঠলো বিশ্ব উষ্ণায়ন ধারণা যখন 1950 সালে S.H.Schneider বিভিণ্ন তথ্যপ্রমাণ দিয়ে দেখালেন যে কার্বন-ডাই-অক্সাইডের পরিমাণ 300 ppm থেকে 600 ppm হয়েগেলে পৃথিবীর গড় উষ্ণতা 1.5 ডিগ্রী সেন্টিগ্রেড এর চেয়েও বৃদ্ধি পাবে l স্নাইডারের এই বার্তা বিজ্ঞানী মহলের বলিরেখায় চিন্তার ভাঁজ সৃষ্টি করলো l অর্থাত্ স্নাইডারের এই সতর্কবাণী আরহেনিয়াসের প্রদীপের ঘৃতাহুতি র কাজ করে শিখার উজ্জ্বলতাকে বাড়িয়ে তুললো l এবং বিজ্ঞানী মহল তথা সমগ্র বিশ্বের কাছে পৌঁছে গেল বিশ্ব উষ্ণায়ন ধারণা l নাসার প্রখ্যাত বিজ্ঞানী J.Hansen (1988) ঘোষণা করেন পৃথিবীর উষ্ণীকরণ ইতিমধ্যেই শুরু হয়ে গেছে l

চিত্রঃ বিশ্ব উষ্ণায়নের ফলে মাটি ফেটে গেছে

সংজ্ঞা :- বিশ্ব উষ্ণায়ন বলতে পৃথিবীর উষ্ণতা বৃদ্ধিকেই বোঝায় l যে পদ্ধতিতে একটি জটিল অবস্থার মধ্য দিয়ে পৃথিবীর প্রাকৃতিক পরিবেশ বিঘ্নিত হয়ে পৃথিবী পৃষ্ঠ ও সংলগ্ন বায়ুমণ্ডল ও জলমণ্ডলের উষ্ণতা ক্রমশঃ বৃদ্ধি হচ্ছে সেই সামগ্রীক পদ্ধতিকে বিশ্ব উষ্ণায়ন বলা যেতে পারে l গুগল উইকিপিডিয়া অনুসারে &বিংশ শতকের মধ্যভাগ থেকে ভূপৃষ্ঠ সংলগ্ন বায়ুমণ্ডল ও সামুদ্রিক জলের গড় তাপমাত্রার ক্রমবর্ধমান বৃদ্ধিকেই বিশ্ব উষ্ণায়ন বলে l

কারণ (Cause):- বিশ্ব উষ্ণায়ন দুটি প্রক্রিয়ার সমন্বয়ক ফল বলা যেতে পারে l এগুলি হল ওজন গ্বহর প্রক্রিয়া ও গ্রীন হাউস প্রভাব l এই দুটির প্রভাবেই যে পৃথিবীর উষ্ণতা ক্রমশ বৃদ্ধি পাচ্ছে তা সর্বজন স্বীকৃত তাই এদের সম্পর্কে না জানলে বিশ্ব উষ্ণায়ন বিষয়টি সম্পূর্ণ ভাবে বোঝা সম্ভব নয় তাই এদের সম্পর্কে সংক্ষিপ্ত আলোচনা করা হল –

ওজন হ্রাস (Ozone Depletion):- তীব্র গন্ধ যুক্ত বিষাক্ত হাল্কা নীল বর্ণের গ্যাস হল ওজন ,যা ভূপৃষ্ঠের উপরিভাগে প্রায় 25 কিঃমিঃ উচ্চতায় সর্বাধিক ঘন l এই গ্যাস সূর্য থেকে বিকিরিত আল্ট্রাভায়োলেট রশ্মির ক্ষতিকারক প্রভাব থেকে জীবকূলকে রক্ষা করে l ওজন স্তর আল্ট্রাভায়োলেট-বি রশ্মি শোষণ করে বায়ুমণ্ডলীয় উষ্ণতার ভারসাম্য রক্ষায় মুখ্য ভূমিকা পালন করে l Ozone শব্দটি গ্রীক শব্দ Ozo= গন্ধ থেকে এসেছে l

ওজন স্তর (Ozone Layer):- পৃথিবীর বায়ুমন্ডলে (অন্যান্য গ্যাস গুলির মতো)ট্রপোস্ফীয়ারের ঊর্ধ্বাংশ থেকে স্ট্রাটোস্ফীয়ারের বিস্তীর্ণ অংশ জুড়ে তীব্র গন্ধ যুক্ত বিষাক্ত হাল্কা নীল বর্ণের ওজন গ্যাসের বৃত্তাকারে বা বলয়াকারে অবস্থানই ওজন স্তর l এই ওজন স্তরের ঘনত্ব সর্বত্র সমান নয় l ভূপৃষ্ঠ থেকে 22-25 কিঃমিঃ উচ্চতায় ইহা সর্বাধিক ঘন l আবার ভূপৃষ্ঠ থেকে এর উচ্চতাও সর্বত্র সমান থাকেনা l

ওজন গঠন (Formation of Ozone):- ওজন হল একটি অস্থিতিশীল গ্যাস l ইহা স্বাভাবিক ভাবে ধ্বংশ হয় আবার সৃষ্টিও হয় l বায়ুমণ্ডলে একটি অক্সিজেন অণুর সাথে একটি অক্সিজেন পরমাণু যুক্ত হয়ে O3 গ্যাসের সৃষ্টি হয় l অক্সিজেন অণু ও অক্সিজেন পরমাণুর বিক্রিয়ায় একটি সতন্ত্র পরমাণু সহযোগিতা করে l ক্রান্তীয় অঞ্চলে Stratosphere অংশে বেশিরভাগ ওজন সৃষ্টি হয় এবং ঐ ওজন প্রবাহিত হয়ে দুই মেরু অঞ্চলে পুঞ্জীভূত l ওজন সৃষ্টির প্রক্রিয়াটি হল – O2+O+M(সতন্ত্র পরমাণু)->O3+M .

ওজন বিনাশ প্রক্রিয়া (Process of Ozone Destruction):- বায়ুমণ্ডলে ওজন বিনাশের প্রক্রিয়া গুলি হল –

Natural Process :- (I)Photo-Chemical Process :- প্রতি 11 বছর অন্তর Sunspot Circle এর জন্য বায়ুমন্ডলের নাইট্রোজেন সূর্যরশ্মির প্রভাবে নাইট্রাস অক্সাইডে পরিণত হয় l এই নাইট্রাস অক্সাইড শীত কালে মেরু অঞ্চলের দিকে প্রবাহিত হয় এবং Stratosphere অঞ্চলের ওজন স্তরে মিশে আলোক রাসায়নিক বিক্রিয়ায় Ozone কে অক্সিজেন অণু ও পরমাণুতে ভেঙে দেয়,ফলে ওজন স্তর পাতলা হয়ে যায় l

Anthropogenic Process :-
Cloren Hypothesis :- পৃথিবীর বিভিণ্ন উত্স থেকে নির্গত CFC গ্যাসের অণুগুলো বায়ুমন্ডলের ক্লোরিন গ্যাসের সঙ্গে যুক্ত হয়ে পরে সুর্যের অতিবেগুনী রশ্মির প্রভাবে বিশ্লিষ্ট হয় এবং ক্লোরিন পরমাণু ওজনের সাথে বিক্রিয়া ঘটিয়ে ওজনকে ক্লোরিন মনোক্সাইড ও অক্সিজেন অনু তে ভেঙ্গে ওজন গ্যাসের বিনাশ ঘটায় l

Sulphet Hypothesis :- আগ্নেয়গিরির অগ্ন্যূৎপাত ও মনুষ্য সৃষ্টির কারণে উত্পন্ন সালফেট অ্যারোসোল বায়ুমণ্ডলের 15-22 কিঃমিঃ উচ্চতায় সমস্ত অক্ষাংশে ছড়িয়ে পড়ে এবং ওজনের সাথে বিক্রিয়া করে ওজন বিনাশ ঘটায় উত্তর গোলার্ধে এর প্রভাব অধিক l

Nitrogen Oxide Hypothesis :- উত্তর সুপারসনিক জেট যান থেকে নির্গত নাইট্রোজেন গ্যাস উচ্চ অক্ষাংশে ওজন বিনাশে অংশ নেয় l

ওজন হ্রাসের কারণ (Cause of Ozone Depletion):- ওজন একটি অস্থিতিশীল গ্যাস l ইহা বায়ুমন্ডলের Stratosphere অংশ থেকে বিভিণ্ন কারণে হ্রাস পাচ্ছে l এর প্রধান কয়েকটি কারণ হল –বায়ুমণ্ডলে ব্যাপক হারে গ্রীনহাউস গ্যাস তথা Co2,CFC,No প্রভৃতি গ্যাসের ঘনত্ব বৃদ্ধি lউন্নত দেশগুলি থেকে অধিক হারে CFC গ্যাস উত্পাদন ও ব্যাবহারের প্রবণতা lউচ্চ অক্ষাংশে চলাচলকারী সুপারসনিক জেট বিমান থেকে নির্গত নাইট্রোজেন অক্সাইডের ওজনের উপর প্রভাব এবং উচ্চ আওয়াজের প্রভাব lমেরু অঞ্চলে বাতাসে ভাসমান বরফ কণার সাথে ওজন গ্যাসের বিক্রিয়া lসূর্য থেকে আগত আল্ট্রাভায়োলেট রশ্মির সাথে ওজনের বিক্রিয়া lপৃথিবী থেকে উৎপন্ন ক্লোরিন অণুর সাথে O3 এর বিক্রিয়া, ইত্যাদি l

গ্রীন হাউস ইফেক্ট সংজ্ঞা (Definition):- পৃথিবী থেকে নিঃসৃত দীর্ঘ তরঙ্গের বিকিরণকে বায়ুমন্ডলের কার্বনডাই-অক্সাইড,ওজন,নাইট্রাস অক্সাইড,ক্লোরোফ্লূরো কার্বন,মিথেন প্রভৃতি গ্যাস ; জলীয় পদার্থ প্রভৃতি অতি সহজেই শোষণ করে বায়ুমন্ডলের উষ্ণতা বৃদ্ধি করে l দীর্ঘ তরঙ্গের বিকিরণকে বায়ুমন্ডল দ্বারা এভাবে ধরে রাখার কৌশল কাঁচ ঘরে উত্তাপ ধরে রাখার কৌশলের অনুরূপ বলে বায়ুমন্ডলের এই প্রক্রিয়া কে গ্রীন হাউস প্রভাব বলে l এক্ষেত্রে শব্দটি রুপক হিসাবে ব্যাবহৃত হয়েছে l প্রকৃতপক্ষে শীত প্রধান দেশে উদ্ভিদ প্রতিপালনের জন্য বাগানের স্বচ্ছ সবুজ কাঁচ নির্মিত ঘরকে গ্রীন হাউস বলেl যাতে সূর্য থেকে আগত ক্ষুদ্র তরঙ্গ রূপী আলোক প্রবেশ করে তাপ শক্তিতে রূপান্তরিত হয়ে বৃহৎ তরঙ্গে পরিণত হয় এবং কাঁচের আচ্ছাদন ভেদ করে আর ফিরে যেতে পারেনা ,ফলে বাগান উষ্ণ থাকে l যা উদ্ভিদের বৃদ্ধির সহায়ক l

Origin of Green House Effect:- পরিবেশ দূষণের অন্যতম পদ্ধতি হল গ্রীন হাউস প্রভাব l সুইডিশ রসায়নবিদ সাভান্তে আরহেনিয়াস 1896 খৃষ্টাব্দে প্রথম Green House Effect শব্দ বন্ধটি ব্যবহার করেন,যার ভিত্তি হল প্রার্থিব বায়ুমন্ডলীয় বায়ুতে ক্রমবর্ধমান Co2 এর পরিমাণ l আরহেনিয়াস Green House Effect শব্দ বন্ধটি ব্যবহার করলেও পৃথিবীতে এরুপ সম্ভাবনার কথা প্রথম ব্যক্ত করেন 1827 সালে ফরাসি গণিতজ্ঞ ব্যাপটিস্ট ফ্যুরিয়ার l

Working Process of Green House Effect:- পৃথিবীর বায়ুমন্ডলের বায়ুর উপাদান গুলির মধ্যে সিংহ ভাগ হল নাইট্রোজেন (78%) এবং অক্সিজেন (21%)l কিন্তু তাপ গ্রহণ ও বিকিরণে এই .দুটি নিষ্ক্রিয় ভূমিকা পালন করে l বায়ুমন্ডলের উষ্ণতা বৃদ্ধির জন্য এরা দায়ী নয় l এর জন্য দায়ী 0.035% (350 ppm)অবস্থান দখলকারী Co2 ; এবং মিথেন,কার্বন মনোক্সাইড, ক্লোরোফ্লূরো কার্বন, নাইট্রোজেন অক্সাইড এবং জলীয়বাষ্প l এইসব গ্রীনহাউস গ্যাস এবং জলীয়বাষ্প পৃথিবীর বায়ুমণ্ডলকে পরতের মতো ঘিরে অবস্থান করে পৃথিবী থেকে বিকিরিত উত্তাপকে আবদ্ধ করে উষ্ণতা বাড়িয়ে তোলে lপৃথিবীর আবহমণ্ডলে আগত সৌর কিরণ প্রতি বর্গ মিটারে 343 Wat হারে উত্তাপ প্রদান করে যা থেকে 16% বায়বিয় কণারধাক্কায় মহাশূন্যে ফিরে যায় এবং অবশিষ্ট 288 Wat তাপশক্তি পৃথিবীকে উত্তপ্ত করে l ফলে পৃথিবীর গড় উত্তাপ বাড়তে থাকে l

Green House Gassess:- গ্রীন হাউস গ্যাস বলাহয় সেইসব গ্যাসকে যারা ভূপৃষ্ঠ দ্বারা বিকিরিত তাপশক্তি শোষণ করে পৃথিবীর উষ্ণতা বৃদ্ধিতে সাহায্য করে l এইসব গ্যাসগুলো হল –প্রতি মুহূর্তে উত্পন্ন 90 কোটি মেট্রিকটন Co2, যা পৃথিবীর গড় উত্তাপ বৃদ্ধিতে 49% অংশ নেয় l10 লক্ষাধিক জাতের 5-10% হারে বর্ধিষ্ণু CFC,যার উষ্ণতা বৃদ্ধিতে গুরুত্ব 14% lবাতাসে 2ppm স্থান দখলকারী ক্রমবর্ধমান মিথেন,যা 18% উষ্ণতা বৃদ্ধিতে সক্ষম lপ্রতি বছর 0.25% হারে বর্ধিষ্ণু নাইট্রাস অক্সাইড যার বায়ুতে পরিমাণ 0.3ppm ; ইহা 6% উষ্ণতা বৃদ্ধিতে সক্ষম lওজন (O3) গ্যাস সূর্যের ক্ষতিকারক অতিবেগুনী রশ্মির হাত থেকে আমাদের রক্ষা করলেও বায়ুমণ্ডলের নিম্নাংশের ওজন গ্যাস গ্রীন হাউস গ্যাস হিসাবে কাজ করে lজলীয়বাষ্প বায়ুমণ্ডলে অবস্থান করে খুব শক্তিশালী গ্রীন হাউস গ্যাস রুপে 13% উষ্ণতা বৃদ্ধিতে সাহায্য করে l

চিত্রঃ কলকারখানা থেকে বিষাক্ত ধোঁয়া বের হচ্ছে

Cause of Increase of Green House Gassess:- মানবীয় সভ্যতার অগ্রগতি,যন্ত্র শিল্পের ব্যাপক প্রয়োগ,জীবাশ্ম জালানির দহন প্রভৃতি নানা কারণে পৃথিবীর গড় উত্তাপ বৃদ্ধিই হল গ্রীন হাউস গ্যাস গুলির প্রধান কারণ l নিম্নে বিভিণ্ন গ্যাসের বৃদ্ধির কারণ গুলি দেখানো হল –Co2এর বৃদ্ধি :-
(I)জীবাশ্ম জালানির দহন কার্বনডাই-অক্সাইড বৃদ্ধির জন্য প্রধান দায়ী l এই জালানি বিভিণ্ন শিল্প,যানবাহন প্রভৃতি থেকে নির্গত হয় যার হার প্রতি মুহূর্তে 90 কোটি মেট্রিকটন l
(II) একজন পূর্ণ ব্যক্তি প্রতিদিন 1.25 লিটার Co2 বাতাসে মেশায় l
(III) সামুদ্রিক প্রাণী প্রতি বছর 99 গিগা টন Co2 উত্পাদন l
(IV) 125 হাজার মাইল আয়ু যুক্ত সাধারণ যান 40-150 টন Co2 বাতাসে ছাড়ে l

CFC এর বৃদ্ধি :- এক অণু CFC গ্রীন হাউস ঘটানোর ক্ষেত্রে Co2 থেকে 5 হাজার গুণ অধিক ক্ষমতা সম্পন্ন l এরুপ একটি গ্যাসের পরিমাণ বৃদ্ধির জন্য মানুষ সরাসরি দায়ী l ইলেকট্রনিক্স শিল্প,রঙ শিল্প,রেফ্রিজারেসন প্রক্রিয়া বৃদ্ধির ফলে CFC র পরিমাণও বৃদ্ধি হচ্ছে l

CH4 এর বৃদ্ধি :- মিথেন হল রঙ ও গন্ধ বর্জিত একটি গ্যাস l পঁচা জৈব আবর্জনা,জীব দেহ থেকে বর্জিত পদার্থ প্রভৃতি এই গ্যাস বৃদ্ধির জন্য দায়ী l শিল্প ক্ষেত্রে যেখানে প্রাকৃতিক গ্যাস ও পেট্রোলিয়াম ব্যবহার হয় সেখান থেকে বছরে 110 মেগা টন মিথেন নিসৃত হয় l সারা পৃথিবীর ধান ক্ষেত থেকে বছরে 60 মেগা টন মিথেন নির্গত হয় lএকটা গরু দিনে তার খাবারের10% (0.2kg)পর্যন্ত মিথেন গ্যাস নিঃসরণ করে l

N2O এর বৃদ্ধি :- লাফিং গ্যাস (Humphrey Devy,1800)নামে পরিচিত নাইট্রাস অক্সাইড প্রতি বছর 0.25% হারে বৃদ্ধি পাচ্ছে l নাইট্রোজেন সারের অতিরিক্ত ব্যবহার এবং অরণ্য হ্রাসের ফলে পরিবেশে ইহা বৃদ্ধি পাচ্ছে l চাষাবাদের জন্য প্রতি বছর কৃষিক্ষেত্র থেকে প্রায় 3.3 মেগা টন N2O বায়ুতে মিশে।

জলীয়  বাষ্পের বৃদ্ধি :- ফলে সূর্য রশ্মির নিরক্ষীয়অঞ্চলে লম্ব কিরণ,উষ্ণ সমূদ্র স্রোত,বার্ষিক উষ্ণতা বৃদ্ধি,সমূদ্র ভাগে আগ্নেয়গিরির অগ্ন্যূত্পাতের ফলে উত্পন্ন তাপের প্রভাবে সমুদ্রপৃষ্ঠের জলের উষ্ণতা বৃদ্ধির ফলে বায়ুমণ্ডলের জলীয় বাষ্প বৃদ্ধি পায় l

Results of Global Warming:- গ্রীন হাউস এফেক্ট পৃথিবীতে সার্বিকভাবে বিশ্ব উষ্ণায়নে (global worming)সাহায্য করে এই বিশ্ব উষ্ণায়ন ও গ্রীন হাউস প্রভাব একই মুদ্রার বিপরীত দিক l এর বৈচিত্রময় প্রভাব গুলি হল –

Effect On Ecosystems :- গ্রীন হাউস বা বিশ্ব উষ্ণায়ন বাস্তুতন্ত্রে যেসব প্রভাব গুলি ফেলে সেগুলো হল –

প্রজাতি বিলুপ্তি (Extinction of Species):- পৃথিবীর উষ্ণতা বৃদ্ধি,ক্রম হ্রাস মান বরফ আচ্ছাদন,ক্রম বর্ধমান সমূদ্র জল তল এবং জলবায়ুর পরিবর্তন প্রভৃতির মাধ্যমে গ্রীন হাউস প্রভাব প্রজাতির বিনাশে সাহায্য করে,যেমন –(i) নিরক্ষীয় অঞ্চলে উষ্ণতা বৃদ্ধির সাথে সাথে প্রবাল,শৈবাল প্রভৃতির সঙ্গে সামুদ্রিক মাছের হ্রাস l(ii) ইংল্যান্ডের পাহাড়ি এলাকার Mountain Ringlet ও Scotch Argass প্রজাতির প্রজাপতির বিলুপ্তি l(iii) কোস্টরিকার মন্তে ভার্দে পাহাড়ের পাদদেশের সোনালী ব্যাঙের অবলুপ্তি ইত্যাদি।

মৃত্তিকার ওপর প্রভাব (Effects on Soils):- সাথে বাতাসে Co2 এর অধিক পরিমাণ ভূপৃষ্ঠের বিভিণ্ন বিয়োজকের ওপর কুপ্রভাব ফেলে তাদের কর্ম ক্ষমতা নষ্ট করে এবং পুষ্টি মৌল গুলিকে কমিয়ে জৈব ভূ-রসায়নিক চক্রের বিঘ্ন ঘটায় l আবার অ্যাসিড বৃষ্টি মাটির সাথে মিশে তার PH মাত্রাকে প্রভাবিত করে ফলে মাটির উর্বরতা কমে l আবার অত্যাধিক উষ্ণতার ফলে প্রস্বেদণ ও বাষ্পীভবনের পরিমাণ বৃদ্ধি পাওয়ায় মাটি শুষ্ক হয়ে পড়ে l

Effect On Hydrosphere :- গ্রীন হাউস এফেক্ট এর জলমণ্ডলের ওপর প্রভাব গুলি নিম্ন রুপ –

Effects on Equatic Fauna :-(i) সমূদ্র জলের উষ্ণতা বৃদ্ধির ফলে মাছ মেরু অঞ্চলের দিকে চলে যাওয়ায় শীতল জলের মাছ ধ্বংস হচ্ছে l (ii) বর্ধিষ্ণু Co2 সমূদ্র জলের উপরিভাগের (10%) জীবের বিনাশ ঘটাচ্ছে l (iii) নীল তিমি,স্যামন,ট্রাউট প্রভৃতি মাছের পরিমাণ কমছে l

চিত্রঃ বিশ্ব উষ্ণায়নের ফলাফল উদাহরণস্বরূপ

Effects on Ocean Currents :- মেরু অঞ্চলের বরফ গলনের প্রভাবে জলের ঘনত্ব কমে যাওয়ার ফলে থার্মো হ্যালাইন সার্কুলেশন ব্যাহত হচ্ছে l ফলে সমূদ্র অংশের শীতল ও উষ্ণ স্রোত তাদের চরিত্র পরিবর্তন করছে l (ii) প্রশান্ত মহাসাগরীয় ক্ষেত্রে এল নিনোর প্রভাব বৃদ্ধি পাচ্ছে এবং দুটি এল নিনোর মধ্যবর্তী সময়রে পার্থক্য কমে আসছে l

Insundation of Coastals lands :- মেরু অঞ্চলের বরফ গলন,নিরক্ষীয় অঞ্চলে পরিচলন বৃষ্টিপাত প্রভৃতির প্রভাবে সমূদ্র তল উত্থিত হয়ে উপকূলীয় অঞ্চল,তটভূমি,উপকূলীয় দ্বীপ এবং মহাসাগরীয় দ্বীপ গুলিতে বন্যার সৃষ্টি হচ্ছে ফলে নিমজ্জিত হচ্ছে l

Effect On Climate System :-Occurrence of Extreme Events :- বিশ্ব উষ্ণায়ন বৃদ্ধির ফলে খরা,বন্যা,মহামারী,তাপপ্রবাহ প্রভৃতি প্রাকৃতিক বিপর্যয় গুলির প্রভাব বৃদ্ধি হচ্ছে l

Change in Rainfall Pattern :- উষ্ণতা বৃদ্ধির ফলে মৌসুমী বায়ুর মতো নিয়ত বায়ুও অনিয়মিত হয়ে পড়ছে l ফলে মহাদেশীয় অংশে বৃষ্টিপাতের সময়,স্থায়িত্ব কাল,পরিমাণ অনিয়ন্ত্রিত হয়ে পড়ছে যা কৃষি ক্ষেত্র,জলসেচ,পানীয় জলের প্রাপ্যতা,মত্স্য পালন প্রভৃতিকে প্রভাবিত করে l

চিত্রঃ হিমবাহ গলন

Impact on Global Winds Pattern :- বায়ুমণ্ডলের গ্যাসের সমতা হ্রাসের সাথে সাথে পৃথিবীর ঝড়েরও প্রকৃতি বদলে যাচ্ছে ,বদলাচ্ছে তীব্রতা l যেমন –1970 সালে তীব্র ঝড় (ক্যাটাগরি 4/S) হ্যারিকেনের হার ছিল 20% বর্তমানে তা বেড়ে দাঁড়িয়েছে 35% এ lএছাড়া বীমা সংস্থা গুলোর ক্ষতি সাধন,মানব সম্প্রদায়ের স্থানান্তরন,ফসলের উত্পাদন হ্রাস,পানীয় জলের সঙ্কট,ম্যানগ্রোভ অরণ্যের ধ্বংস প্রভৃতি আর্থ-সামাজিক প্রভাব ও রয়েছে l

Trends of Global Warming:- ঊনবিংশ শতকের মধ্যভাগ থেকে পৃথিবীর গড় তাপমাত্রা (15 ডিগ্রি C) ধীরে ধীরে বৃদ্ধি পেতে থাকে l বিজ্ঞানীদের মতে আজ থেকে প্রায় 425 কোটি বছর আগে পৃথিবীর গড় তাপমাত্রাছিল 37 ডিগ্রি সে. এর বেশী l দীর্ঘ পরিবর্তন ও ও বিবর্তনের পর পৃথিবী তার বর্তমান 15 ডিগ্রী সেন্টিগ্রেড গড় তাপমাত্রায় পৌঁছায় l কিন্তু বিংশ শতক থেকে উষ্ণতার গতিপ্রকৃতি দ্রুত পরিবর্তিত হতে থাকে l বিগত 2000 বছরের মধ্যে বিংশ শতক উষ্ণতম হিসাবে স্বীকৃতি পায় বিজ্ঞানী মহলে l এই শতকে 0.5 ডিগ্রী C থেকে 0.7 ডিগ্রি C উষ্ণতা বৃদ্ধি পায় বলে বিজ্ঞানীদের অভিমত l বিংশ শতকের শেষ দুটি দশক অর্থাত্ 1980 ও 1990 ছিল উষ্ণতম দশক l 1860-1920 খ্রিস্টাব্দ পর্যন্ত উষ্ণতা বৃদ্ধির হার ছিল 0.2 ডিগ্রি C থেকে 0.4 ডিগ্রি C l 1921-1945 পর্যন্ত ইহা 0.4 ডিগ্রি C এ অপরিবর্তিত থাকে l 1946-1998 পর্যন্ত 0.45 ডিগ্রি C হারে উষ্ণতা বৃদ্ধি পেতে থাকে l 1998 এর পর থেকে উষ্ণতা বৃদ্ধির হার ক্রমবর্ধমান l NASA এর এক সমীক্ষা অনুযায়ী বিশ্ব ইতিহাসে উষ্ণতম 25 টি বছরের মধ্যে একবিংশ শতকের প্রথম দশকের 9টি বছর অবস্থান করছে l 2005 সালের উষ্ণতা ছিল বিজ্ঞানীদের কাছে বিস্ময়ের কেন্দ্রবিন্দু l IPCC (2005) এর মতে বিগত 100 বছরে পৃথিবীর গড় উষ্ণতা বেড়েছে 0.75 ডিগ্রি C, একই হারে উষ্ণতা বৃদ্ধি অব্যাহত থাকলে 2025 নাগাদ গড় উষ্ণতা বৃদ্ধি পাবে 0.4 ডিগ্রি C- 1.1 ডিগ্রি C; 2050 পর্যন্ত যা পৌঁছাবে 0.8 ডিগ্রি C-2.6 ডিগ্রি C এবং 2100 নাগাদ 1.4 ডিগ্রি C থেকে 5.8 ডিগ্রি C এ l এখানে মনে রাখা উচিত মায়োসিন অধি যূগে পৃথিবীর গড় উষ্ণতা বৃদ্ধি পেয়েছিল মাত্র 4 ডিগ্রি C এবং পরিণাম স্বরূপ পৃথিবীর অধিকাংশ প্রাণী অবলুপ্ত হয় l সমসাময়িক কালের উষ্ণতা বৃদ্ধির হার অব্যাহত থাকলে ভবিষ্যৎ পৃথিবীর করুন দশা অনুমান করা আশাকরি কারো কাছেই খুব একটা কঠিন হবেনা l

Evidence of Global Warming:- এখণ প্রশ্ন হল পৃথিবী যে প্রকৃতই গরম হয়ে চলেছে তা বুঝবো কীভাবে ? অর্থাত্ এর প্রমাণ কী ?এই কৌতুহল নিরসনের জন্য আমরা বৈজ্ঞানিক দৃষ্টিকোণ থেকে কয়েকটি প্রমাণ তুলে ধরতে পারি, যেমন –

উষ্ণতা বৃদ্ধির নথি :- বিশ্ব উষ্ণায়নের গতিপ্রকৃতি থেকে এটা স্পষ্ট যে পৃথিবী ক্রমশ উষ্ণ হচ্ছে l উষ্ণতা পরিমাপক বিভিণ্ন যন্ত্রের নথি থেকে জানাযায় বিংশ শতকে স্থলভাগ ও জলভাগের উষ্ণতা বৃদ্ধি পেয়েছে 0.75 ডিগ্রি C l আপেক্ষিক ভাবে এই উষ্ণতা বৃদ্ধির হার প্রতি দশকে গড়ে স্থলভাগে 0.25 ডিগ্রি C এবং জলভাগে 0.13 ডিগ্রি C l স্যাটেলাইট তাপমান যন্ত্রের তথ্য অনুযায়ী নিম্ন বায়ুমণ্ডলে 1978 পর্যন্ত 0.12 ডিগ্রি C থেকে 0.22 ডিগ্রি C হারে উষ্ণতা বৃদ্ধি পেয়েছে l UK Climatic Research Unit এর মতে 2005 হল বিশ্বের দ্বিতীয় উষ্ণতম বছর l বিজ্ঞানী M. Manabe তাঁর আবিষ্কৃত (1975) Circulation Model দ্বারা ভবিষৎ বাণী করেন যে, বায়ুমণ্ডলে বর্তমান (1975) স্থিত Co2 এর পরিমাণ যদি দ্বিগুণ হয়ে যায় তবে ভূপৃষ্ঠের উষ্ণতাও দ্বিগুণ হয়ে যাবে l এরুপ পূর্বাভাষ আমরা স্নাইডারের মডেল থেকেও পাই l সুতরাং পৃথিবী যে উষ্ণ হচ্ছে বলার অপেক্ষা রাখে না l

চিত্রঃ আটলান্টিক-র বরফ গলন

বরফ ও হিমবাহের গলণ :- বর্তমাণে পৃথিবীর স্থলভাগের মোট 10% হিমায়িত l অ্যান্টার্কটিকা ও গ্রীনল্যান্ড বরফের এই দুই স্বর্গ ভূমি থেকে বরফ চাঁই গলণ এবং বরফের স্তরে ফাটল সৃষ্টি এই ঘটনা গুলো হামেশাই ঘটে চলেছে l অ্যান্টার্কটিকায় এই গলনের পরিমাণ বাত্সরিক প্রায় 100 মিটার lএখানে অবস্থিত B-15 নামক 10,000বর্গ কিঃমিঃ বিস্তৃত হিমবাহ টির বর্তমানে প্রায় 3200 বর্গ কিঃমিঃ অবশিষ্ট রয়েছে l লার্সেণ হিমবাহও প্রায় 40% গলে জল l বেরিং সাগরের বরফ আচ্ছাদন 1960 এর তুলনায় প্রায় 8% কমে গেছে l আর্কটিক মহাসাগরের বরফ আচ্ছাদন 1978 এর অবস্থা থেকে প্রায় 9000 বর্গ কিঃমিঃ কমে গেছে l Geological Survey of India এর একটি তথ্য অনুযায়ী ভারতের হিমাচল প্রদেশের বাসপা উপত্যকায় 2001 ও 2002 সালে যথাক্রমে 90 ঘন মিঃ ও 78 ঘন মিঃ বরফ গলে যায় l GSI এর মতে একি হারে বরফ গলণ চলতে থাকলে 2040 নাগাদ হিমবাহটি অদৃশ্য হয়ে যাবে l তথ্য অনুযায়ী রাশিয়ায় মুকুট ককেশাস পর্বতের হিমবাহ 1960 থেকে গলতে গলতে বর্তমানে প্রায় অর্ধেকের কমে এসে পৌঁছেছে l আফ্রিকার কিলিমাঞ্জারো তে অবশিষ্ট রয়েছে 25% l মাউন্ট কেনিয়া তো ন্যাড়া মাথায় হাহুতাশ করছে l বোঝাই যায় বিশ্ব উষ্ণায়ন এতো তীব্র হয়ে চলেছে যে আগামী 2050 পর্যন্ত হিমবাহ গুলি ইতিহাসের পাতায় না চলে গেলে হয় l

চিত্রঃ বিশ্ব উষ্ণায়নের প্রভাব

আবহাওয়ার পরিবর্তন :- আবহাওয়ার দিকে এক নজর দেখলে তার খামখেয়ালীপানাই চোখে পড়ে l আর এই প্রভাব ভোগ করছে পৃথিবীর বিভিণ্ন অঞ্চল l 1988 সালের ভয়াবহ খরা সভ্য সমাজের চোখে আঙ্গুল দিয়ে দেখিয়ে দিয়েছে প্রকৃতির বিভত্স রুপ l উষ্ণায়নের পৃষ্ঠ ভূমি আমেরিকা যুক্তরাষ্ট্রে ঐ বছর ফসল উত্পাদন না বরাবর l তৃণভূমিগুলি চলে যায় দাবানলের কবলে l অন্যদিকে পরিসংখ্যান অনুযায়ী 1950 এর দশকে সারা পৃথিবীতে 50 টি ভয়ঙ্কর বন্যা ঘটে l 80 র দশকে 276 টি এবং 2001 দশকে 700 এর অধিক l শুধু খরা বা বন্যাই নয় গোদের ওপর বিষফোঁড়া হিসাবে জুড়ে বসেছে বিভিণ্ন ধরণের ঘূর্ণিঝড় l এবং এর তীব্রতা যে কতো তা Regional Specialized Meteorological Center (RSMC)দ্বারা প্রস্তুত কৃত ঝড়ের তালিকা এক ঝলক দেখলেই বোঝা যায় l 2004 – 2017 পর্যন্ত শুধুমাত্র উত্তর ভারত মহাসাগরেই 30 টির বেশী ঘূর্ণিঝড় আছড়ে পড়েছে l যাদের মধ্যে গিরি, গোনু, সিডর, নার্গিস, মালা, ফাইলিন, লায়লা, ছিল অন্যতম l প্রকৃতির এরুপ ক্রমবর্ধমান খামখেয়ালীপানা বিশ্ব উষ্ণায়নের দিকেই ইঙ্গিত করে l

সামুদ্রিক জলের উষ্ণতা ও জল তল বৃদ্ধি :- বিংশ শতকের দ্বিতীয়ার্ধের নথি অনুযায়ী সামুদ্রিক অংশে 800-3000 মিঃ গভীরতায় গড়ে প্রায় জলের উষ্ণতা 0.6 ডিগ্রী সেন্টিগ্রেড বৃদ্ধি পেয়েছে এবং সমুদ্র জল তলের উচ্চতা বৃদ্ধি পেয়েছে 10-15 সেমিঃ l একি হারে উষ্ণতা বৃদ্ধি পেতে থাকলে এবং একবিংশ শতাব্দীর শেষে তা যদি মাত্র 3 ডিগ্রী সেন্টিগ্রেডে পৌঁছে তবে সমুদ্রপৃষ্ঠ 1 মিঃ উচ্চতা লাভ করে পৃথিবীর উপকূলবর্তী ও দ্বীপ অঞ্চল গুলির সর্বনাশ ডেকে আনবে l l National Oceanic and Atmospheric Administration (2016) এর তথ্য অনুযায়ী 1970 -000 সাল পর্যন্ত প্রতি দশকে প্রায় 0.12 C হারে সমুদ্র জলের উষ্ণতা বেড়েছে l বিশ্ব উষ্ণায়নের ফলেই সামুদ্রিক জলের উষ্ণতা বৃদ্ধি পেয়ে এল নিনোর মতো প্রাকৃতিক ঘটনা মাত্রাতিরিক্ত ভাবে তীব্র হচেছ বলে অনেকই মনে করেন l 1982-83 সালে এল নিনো কেড়ে নিয়েছিল প্রায় 2000 লোকের জীবন এবং এক হাজার তিনশো কোটি ডলারের সমতুল্য সম্পদ l বর্তমান সময়কালে দুটি এল নিনোর মধ্যবর্তী সময়কাল অনেকটা কমে গেছে বলেই মনে করা হয় l সুতরাং উষ্ণায়ন যে জল ভাগ কেও ছাড়েনি তা স্পষ্ট lবিশ্ব উষ্ণায়নের বাস্তবতা বিচারের জন্য উপরোক্ত প্রমাণ গুলিকে ভিত্তি হিসাবে ধরে নিয়ে পরোক্ষ ভাবে আরো অনেক প্রমাণ তুলেধরা যায়, যা স্বাভাবিক ভাবেই বিশ্ব উষ্ণায়ন ধারণা কে সমর্থন করে, যেমন : বৃষ্টিপাত সংঘটন পদ্ধতির পরিবর্তন; বিভিণ্ন মারণ রোগের প্রাদূর্ভাব বৃদ্ধি; সামুদ্রিক ও মহাদেশীয় বাস্তু তন্ত্রের সমতা বিঘ্নিকরণ; পৃথিবীর জল সঙ্কট ও দুর্ভিক্ষ; উষ্ণ বায়ু স্রোতের পরিমাণ বৃদ্ধি – ইত্যাদি l

চিত্রঃ জীবজগতের উপর বিশ্ব উষ্ণায়নের প্রভাব

Steps of Control of Global Warming:- বিশ্ব উষ্ণায়ন এর পরিমাণ কমানোর কোন তাত্ক্ষণিক উপায় নেই l কারণ যেসব গ্যাস গ্রীন হাউস প্রভাবে সাহায্য করে তাদের বায়ুমণ্ডলে আয়ুষ্কাল দীর্ঘ,যেমন – কার্বনডাই-অক্সাইড বাতাসে 200 বছরধরে,নাইট্রাস অক্সাইড প্রায় 115 বছর ধরে,মিথেন প্রায়12বছর ধরে এবং ক্লোরোফ্লূরো কার্বন 100 বছর ধরে অক্ষত অবস্থায় থাকে l তাই আজকের অবিবেচিত কর্মফল প্রায় আগামী 150-200 বছর ভোগাবে l তবে ভবিষ্যতের কথা চিন্তা করে কিছু পদক্ষেপ গ্রহণ করলে আগামী দিনে হয়ত পৃথিবী কিছুটা হলেও উষ্ণায়নের কবল থেকে মুক্ত হতে পারে ; যেমন –

Decrease use of non-renewable power :- শক্তির উত্স হিসেবে কয়লা,পেট্রোলিয়াম প্রভৃতি প্রচলিত শক্তির ব্যবহার কমাতে হবে আর এর জন্য অপ্রয়োজনীয় সময়ে বাল্ব,ফ্যান,ফ্রিজ,এয়ারকন্ডিশনার প্রভৃতি বন্ধ রাখা জরুরী l

Increasing use of renewable power :- পরিবেশ বান্ধব বিভিণ্ন অ-চিরাচরিত শক্তি যথা – সৌর শক্তি,বায়ু শক্তি,জোয়ার-ভাটা শক্তি,ভূ-তাপ শক্তি,সামুদ্রিক ঢেউ ও স্রোতের শক্তি প্রভৃতির ব্যবহার বৃদ্ধি করতে হবে l

Decrease use of comfortable machines :- ভবিষ্যতের কথা চিন্তা করে এসি,ফ্রিজ,রেফ্রিজারেটর প্রভৃতির ব্যবহার কিছুটা কমিয়ে পরিবেশে CFC বা HCFC এর পরিমাণ কমানো কিছুটাও সম্ভব l

Decrease use of car :- প্রচলিত শক্তি চালিত যানবাহন ব্যবহার কমিয়ে বা বিদ্যুত্ চালিত মোটর যান,ব্যাটারি চালিত মোটর যান বা জৈব ডিজেল চালিত মোটর যান ব্যবহার করেও পরিবেশে কার্বনডাইঅক্সাইড,কার্বন মনোক্সাইড প্রভৃতির পরিমাণ কমানো সম্ভব lএছাড়া -রি-সাইকেল হয় এমন দ্রব্যের ব্যবহার বৃদ্ধি করে,প্রচুর পরিমাণে নূতন অরণ্য সৃজনের মাধ্যমে,সাধারণ বাল্ব এর পরিবর্তে ফ্লুরোসেন্ট ব্যবহার করে,রিচার্জেবল ব্যাটারি ব্যবহার করে,বাতাসে গ্রীন হাউস গ্যাসের সরবরাহ কমানোর জন্য গবেষণা করে,কিয়োটো চুক্তি মেনে চলে ,এবং সর্বশেষজন সাধারণের মধ্যে গ্রীন হাউস প্রভাব সমন্ধে সচেতনতা সঞ্চার করে ইহা রোধের প্রচেষ্টা করা যেতে পারে l

চিত্রঃ বিশ্ব উষ্ণায়ন বন্ধ করুন

পরিশেষে বলা যায় উপরোক্ত আলোচনা বিচার করলে বিশ্ব উষ্ণায়নের চোখ রাঙানীই প্রকট হয়ে ওঠে l বর্তমান সময় থেকেই যদি বিশ্ববাসী দৃঢ়তার সাথে এর মোকাবিলা না করতে পারে তাহলে অদূর ভবিষ্যতে মনুষ্য প্রজাতিকে সংরক্ষণ করতে বিজ্ঞানী দের বিকল্প ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে l বিশ্ব উষ্ণায়নের ব্যপকতা সকল রাষ্ট্রই অবগত কিন্তু নিজ নিজ অর্থনীতিকে বাঁচিয়ে রাখতে গিয়ে এর বাস্তবতা অনেক রাষ্ট্রই ভুলে যায় l এভাবে চলতে থাকলে অচিরেই যে আমরা আমাদের অস্তিত্ব খুইয়ে বসব তা অনস্বীকার্য l আসুন আমরা সকলে মিলে আমাদের এই পরিবেশকে বাঁচাতে প্রজাতন্ত্র দিবসের এই শুভ ক্ষণে শপথ নিই l শপথ নিই নির্মল ভারত গড়ার l নির্মল বিশ্ব গড়ার l এগিয়ে যাই ‘সংকল্প থেকে সাফল্য’ এর দিশায় l

লেখকঃ গোপাল মণ্ডল (সহকারী সম্পাদক, মিশন জিওগ্রাফি ইন্ডিয়া)

এখান থেকে শেয়ার করুন
  • 72
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
    72
    Shares

Leave a Reply

মন্তব্য করুন

error: মিশন জিওগ্রাফি ইন্ডিয়া কর্তৃক সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত