আলোক দূষণ! দাও ফিরে সেই অন্ধকার

আলোক দূষণ! দাও ফিরে সেই অন্ধকার

আমরা মৃত্তিকা দূষণ, শব্দ দূষণ, জল দূষণ ও বায়ু দূষণের নাম শুনেছি, কিন্তু আমরা কি “আলোক দূষণ” বা Light Pollution -এর নাম শুনেছি? বর্তমানে কৃত্রিম আলোর ব্যবহার ব্যাপক পরিমাণে বৃদ্ধি পাচ্ছে, যার ফলে পৃথিবী থেকে হারিয়ে যাচ্ছে রাতের অন্ধকার। বিজ্ঞানীরা বলছেন, ২০১২ থেকে ২০১৬ সালের মধ্যে প্রতি বছরে কৃত্রিম আলোর পরিধি বেড়েছে দুই শতাংশ। এই মাত্রাতিরিক্ত আলোর তীব্রতা সৃষ্টি করেছে আলোক দূষণের। যার ফলস্বরূপ জীবজগতের ওপর ক্ষতিকারক প্রভাব পড়ছে। বিভিন্ন পশু, পাখিসহ জলজ প্রাণীর আলোক দূষণের ফলে মৃত্যু ঘটছে। এমনকি মানব জীবনের উপরেও এর প্রভাব পড়ছে। আলোক দূষণ মানুষের দেহে জন্ম দিচ্ছে বিভিন্ন রোগের। আলোক দূষণ অন্ধকার ও আলোর ভারসাম্যকে বিনষ্ট করছে। যার জন্য পরিবেশ সহ সমগ্র বাস্তুতন্ত্রের ব্যাপক ক্ষতির মুখে পড়তে চলেছে।

কিন্তু কিভাবে জন্ম নিলো “আলোক দূষণ” বা “Light Pollution” এর? আসুন জেনে নেওয়া যাক।

আলোক দূষণ

১৮৭৯ সালে টমাস আলভা এডিসন আবিষ্কৃত ইনক্যানডিসেন্ট বাল্ব প্রথম জ্বলতে শুরু করে নিউ ইয়র্ক শহরে। সেই থেকেই শুরু। অতি দ্রুততার সাথে কৃত্রিম আলো ছড়িয়ে পড়ে সমগ্র বিশ্বে। আবাসিক বাড়ি, অফিস ভবন, সেতু, ফ্লাইওভার, শহরের রাজপথ, হাইওয়ে, সর্বত্র ছড়িয়ে পড়ে কৃত্রিম আলোর বন্যা। পৃথিবীর বুক থেকে কৃত্রিম আলো কেড়ে নিচ্ছে রাতের অন্ধকার। আর সেটাই আধুনিক সভ্যতার কাল হয়ে দাঁড়াচ্ছে। অত্যধিক কৃত্রিম আলোর ব্যবহার জন্ম দিয়েছে আলোক দূষণের।

আলোক দূষণ

২০১৯ সালে প্রকাশিত Urban Climate জার্নালের তথ্য অনুযায়ী, গত দুই দশক ধরে নিয়মিত ভাবে ভারতের বিভিন্ন শহরে ঘরের বাইরে তীব্র আলোর প্রকোপ বৃদ্ধি পেয়েছে। পবন কুমারের নেতৃত্বে যে সমীক্ষা করা হয়েছে সেই সমীক্ষায় বলা হয়েছে, “নতুন দিল্লি, তেলঙ্গনা, মহারাষ্ট্র, কর্নাটক ও উত্তরপ্রদেশ – যেসব জায়গায় বাইরের কৃত্রিম আলোর প্রভাব ছিল, সেই সব জায়গায় তা ১৯৯৩ সাল থেকে ২০১৩ সালের মধ্যে আরও বেড়েছে। পশ্চিমবঙ্গ, গুজরাট ও তামিলনাড়ুও কম আলোর জায়গা থেকে বেশি আলোর জায়গায় পরিণত হয়েছে।”

আলোক দূষণ

আমরা ছোটো বেলায় যখন রাতের আকাশের দিকে তাকিয়ে থাকতাম তখন আমরা খালি চোখে আকাশে বিভিন্ন মহাজাগতিক দৃশ্য দেখতে পেতাম। এমনকি আমরা আমাদের ছায়াপথ আকাশগঙ্গা কেও খুব স্বচ্ছ ভাবে দেখতে পেতাম। কিন্তু বর্তমানে রাতে কৃত্রিম আলোর তীব্রতা বেড়ে যাওয়ায় আমরা আর দেখতে পাই সেই সুন্দর মহাজাগতিক দৃশ্যগুলিকে।

আলোক দূষণ

গবেষণায় দেখা গেছে, সময় ও দেশভেদে আলোর তীব্রতা কমে বা বাড়ে। বিশ্বের সবচেয়ে আলোকিত দুটি দেশ স্পেন ও যুক্তরাষ্ট্রে আলোর তীব্রতা আগের মতোই আছে। তবে দক্ষিণ আমেরিকা, আফ্রিকা ও এশিয়াতে আলোর তীব্রতা ক্রমশ বাড়ছে। কিন্তু যুদ্ধবিধ্বস্ত সিরিয়া ও ইয়েমেনে আলোর তীব্রতা কমেছে।

আলোক দূষণ

সমুদ্রের পার্শ্ববর্তী যেসব শহর রয়েছে তার কৃত্রিম আলোর তীব্রতা অধিক হওয়ায় সামুদ্রিক প্রাণীদের ব্যাপক ক্ষতি হচ্ছে। তারা বুঝতে পাচ্ছেনা এখন দিন না রাত। রাতের বেলায় ছোটো ছোটো কচ্ছপ জলে যাওয়ার বদলে আলোর আকর্ষণে রাস্তায় চলে আসে, যার ফলে প্রতিবছর প্রচুর কচ্ছপ মারা যাচ্ছে।

আমরা জানি, নিশাচর প্রাণীরা রাতের বেলায় খাবার সংগ্রহ করে। কিন্তু রাত্রিতে অন্ধকার যদি গোধুলির সময়ের চেয়ে অধিক না হয়, তাহলে নিশাচর প্রাণীরা অসুবিধায় পড়ে কষ্ট পায়। বিভিন্ন নিশাচর পাখি রাতের বেলায় খাবার সংগ্রহের সময় রাস্তার আলোতে আকর্ষিত হয়ে গাছ ও বহুতলের সাথে ধাক্কা লেগে মারা যায়। মার্কিন রিপোর্ট অনুসারে, প্রতি বছর নিউ ইয়র্ক শহরে প্রায় ১০ হাজার পরিযায়ী পাখি মোবাইল টাওয়ার অথবা বহুতলে ধাক্কা খেয়ে জখম হচ্ছে অথবা মারা যাচ্ছে৷ জার্নাল নেচারের সাম্প্রতিক গবেষণা বলছে, কৃত্রিম আলো পরাগযোগ কমিয়ে আনছে, যা রাতজাগা পোকামাকড়ের কার্যক্রম কমিয়ে আনছে।

আলোক দূষণ

আলোক দূষণের প্রভাব প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ ভাবে মানুষের ওপরও পড়ছে। নয়া এক গবেষণা থেকে প্রকাশ, বিশ্ব জনসংখ্যার ৮৩ শতাংশ মানুষ রাতে আলোক দূষণের মধ্যে থাকে। বড়ো বড়ো শহরে রাতের বেলায় কৃত্রিম আলোর তীব্রতা এতটাই বেশি হয় যে রাতের অন্ধকার বোঝায় যায় না। যার ফলে মানব দেহে আলো ও অন্ধকারের ভারসাম্য বিঘ্নিত হয়। কেননা দিনের বেলায় মানুষের কাজ করার ক্ষমতা ও রাতের বেলায় কাজ করার ক্ষমতা ভিন্ন হয়। ফলস্বরূপ মানব দেহে বিভিন্ন রোগের সৃষ্টি হয়। অধিক তীব্রতা যুক্ত আলোর সামনে থাকলে মানসিক অবসাদ, অনিদ্রা, মাথাব্যাথা, চোখের ক্ষতি, এমনকি ক্যান্সারও হতে পারে।

আলোক দূষণ

আমরা জানি, অন্ধকার হলো খারাপের প্রতীক, আর আলো হলো সব ‘ভালো’র প্রতীক। কিন্তু এই আলোই আমাদের ভবিষ্যত অন্ধকার করে দিচ্ছে। এখনও সময় রয়েছে আমরা সচেতন হলেই “আলোক দূষণ” প্রতিরোধ করা সম্ভব। কেননা অন্ধকার না থাকলে আলোর কোনো মূল্য নেই। হয়তো আমরা একদিন বলবো ‘দাও ফিরে সেই অন্ধকার’!

লেখকঃ- সৌরভ সরকার (সম্পাদক, মিশন জিওগ্রাফি ইন্ডিয়া)।
প্রথম প্রকাশঃ ভূগোলিকা ফেসবুক পেজ, দ্বিতীয় বর্ষপূর্তি-৩০/০৩/২০১৯

তথ্যসূত্রঃ Wikipedia, BBC News, Nature Jurnal, Urban Climate Jurnal, Discovery Science, Gomati District Science Forum, Dailyo, এবেলা, বিজ্ঞান পত্রিকা।

©Mission Geography India
©ভূগোলিকা-Bhugolika

Content Protection by DMCA.com
এখান থেকে শেয়ার করুন

মন্তব্য করুন

//pagead2.googlesyndication.com/pagead/js/adsbygoogle.js //pagead2.googlesyndication.com/pagead/js/adsbygoogle.js //pagead2.googlesyndication.com/pagead/js/adsbygoogle.js
//pagead2.googlesyndication.com/pagead/js/adsbygoogle.js
error: মিশন জিওগ্রাফি ইন্ডিয়া কর্তৃক সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত