টেকনোলজি দুনিয়ার নূতন দ্বার

প্রগতিশীল বিজ্ঞানে ‘টেকনোলজি’ এক গুরুত্বপূর্ণ বিষয় I বিজ্ঞানের নিত্যনতুন খোঁজে নিরন্তর ভাবে ব্যবহার হয়ে চলেছে প্রযুক্তি I পৃথিবীর আনাচে কানাচে তো বটেই মহাজগৎও এখন প্রযুক্তির বেড়াজালে সীমাবদ্ধ হতে চলেছে I গ্রহ থেকে উপগ্রহ, নক্ষত্র থেকে ছায়াপথে নজরদারী চালাতে গিয়ে বিজ্ঞান তার উন্নতির অভাবনীয় শিখরে I কিন্তু হাতের মুঠোয় সমগ্র মহাজগৎ ধরতে বিজ্ঞানের নিরলস প্রচেষ্টার ক্ষান্তি নেই I

অচিরেই হয়তো বা আমরা মহাজগতের মানচিত্র পেতে চলেছি NASA র TESS প্রযুক্তির সহায়তায় (18 ই এপ্রিল 2018 এ নাসা TESS Space Telescope উৎক্ষেপণ করলো ) , আর এরকম হলে কেমন হয় ? কেমন হয় যদি একটা কলমের নীপের আগা পরিমাণ পরিসরে এনসাইক্লোপিডিয়া ব্রিটানিকার চব্বিশটি খণ্ড লেখা হয় আর আপনি তা অনায়াসে পড়তে পারেন I না না, পাগলামি নয় এটাই বিজ্ঞান এবং বিজ্ঞানের ভবিষ্যৎ ক্ষেত্র I

বিজ্ঞানের বিভিন্ন ক্ষেত্রে পারমাণবিক, আণবিক বা বৃহৎ আণবিক স্তরে পদার্থকে নিপুণ ভাবে ব্যবহার করে তার উপযোগিতার পরিবর্তন সাধনে ক্ষুদ্রাতিক্ষুদ্র পদার্থগুলি তৈরি করা হয় I আরো ছোট, আরো দ্রুত এবং আরো তীক্ষ্ণ বেগে এগুতে গেলে পদার্থের সূক্ষাতিসূক্ষ অংশের ব্যবহার আবশ্যিক হয়ে পড়ে কিন্তু পদার্থের পারমাণবিক স্তরে পৌঁছে গেলেই সনাতন পদার্থবিদ্যা বা রসায়নবিদ্যার কোন নীতি কাজ করেনা, কারণ এই অবস্থায় পদার্থের আচরণ নাটকীয়ভাবে পরিবর্তিত হয়ে যায় I তার কাঠিন্য, বর্ণ, তড়িত্ পরিবাহিতা এবং ওজন কোন কিছুই পূর্বাবস্থায় থাকে না I এই পরম পরিসরে পদার্থের এরূপ আচরণের কারণ খুঁজতে গিয়েই বিজ্ঞান এগিয়ে গেল তার নূতন দ্বারের দিকে I বিকশিত হল বিজ্ঞানের সেই শাখা যেখানে পদার্থের ক্ষুদ্রাতিক্ষুদ্র অংশ নিয়ে আলোচনা করা হয় এবং প্রয়োগবিদ্যার মাধ্যমে সেগুলিকে বাস্তব ক্ষেত্রে ব্যবহার করে ব্যবহারিক বা বাস্তবিক প্রতিবন্ধকতাগুলি অতিক্রম করে আণবিক স্তরে গবেষণার পথ আরো সহজ হয়ে ওঠে I বিকাশ ঘটল “ন্যানোটেকনোলজি”র I

আরও দেখুন “বিশ্বের দীর্ঘতম মাটি নির্মিত বাঁধ, হীরাকুদ”

1959 সালের 29 সে ডিসেম্বর ক্যালিফোর্নিয়া ইনস্টিটিউট অফ টেকনোলজির আহ্বানে আয়োজিত An American Physical Society Meeting এ আমেরিকান পদার্থবিদ Richard Feynman “There’s Plenty of Room at the Bottom” নামাঙ্কিত বক্তব্য প্রসঙ্গে একক অনু ও পরমাণুর গণনা ও নিয়ন্ত্রণের সম্ভাবনার কথা উল্লেখ করেন এবং সূত্রপাত হয় “ন্যানোটেকনোলজি”র I

Richard Feynman
Image: Richard Feynman

কি এই ন্যানোটেকনোলজি ? উত্তরে বলা যায় ন্যানোটেকনোলজি হল বিজ্ঞানের সেই প্রযুক্তি ও প্রয়োগ যেখানে 100 ন্যানোমিটার আয়তনের থেকেও সূক্ষ নির্দিষ্ট কোন বস্তুর উপর গবেষণা চালানো সম্ভব I সঠিক ভাবে বুঝলামনা তো ? আসলে ন্যানোমিটার এর অর্থ কি ? অবশ্যই ! 1 ন্যানোমিটার বলতে বোঝায় 1 মিটার এর এক লক্ষ ভাগের এক ভাগ বা সংখ্যাগত ভাবে 10-9 মিটার I উদাহরণ হিসাবে বলাযায় একটি সংবাদপত্রের পাতার পুরুত্ব 1,00,000 nm এবং আমাদের মাথার চুলের পুরুত্ব 60-80 হাজার ন্যানোমিটার I এগুলো সবেই দৃশ্যমান কিন্তু ন্যানোটেকনোলজি 1nm থেকে 100 nm পর্যন্ত পুরু কোন বিষয়ের উপর গবেষণার ক্ষেত্র I

Nanotechnology র জনক R.Feynman এর বক্তব্যের প্রায় এক দশক পরে Professor Norio Taniguchi 1974 সালে প্রথম ‘Neno Technology’ শব্দবন্ধ চয়ন করেন I সম্ভাবনা থাকলেও এই সময় বিষয়টি ছিল খুব কঠিন কারণ, এতো সূক্ষ বস্তু দেখার মতো অত্যাধুনিক যন্ত্রের অস্তিত্বই ছিল না I অবশেষে 1981 সালে সুইজারল্যান্ডের IBM ল্যাবরেটরিতে বিজ্ঞানী (নোবেল জয়ী) Gerd Binning এবং Heirrich Rohrer আবিষ্কার করেন Scanning Tunneling Microscope যা দিয়ে কোন ক্ষেত্র বা পৃষ্ঠের একক পরমাণুর অবস্থানের ছবি তোলা সম্ভব হল এবং ন্যানোটেকনোলজির সম্ভাবনাকে বাস্তবে রূপান্তরিত করে আধূনিক ন্যানোটেকনোলজির সূচনা ঘটলো I 1985 তে Robert F. Curl, Harold W. Kroto এবং Richard E. Smalley বিজ্ঞানী ত্রয়ীর “Fullerene”(হীরক ও গ্রাফাইটের পর আবিষ্কৃত কার্বনের তৃতীয় রূপভেদ) আবিষ্কার ন্যানোটেকনোলজিকে আরো এগিয়ে যেতে সাহায্য করে I 1986 তে আরেকধাপ এগিয়ে আমেরিকান বিজ্ঞানী K.Eric Drexler তাঁর ‘Engine of Creation’ নামক গ্রন্থে বিশদ আলোচনার মধ্যদিয়ে ন্যানোটেকনোলজির পথকে আরো প্রসারিত করে তোলেন I তিনিই হলেন প্রথম বিজ্ঞানী যিনি Molecular Nano Technology বিষয়ে প্রথম Ph.D অর্জন করেন এবং তা অর্জন করেন Massachusetts Institute of Technology থেকে I 1992 সালে তাঁর আরেকটি বিখ্যাত বই ‘Nanosystem’ প্রকাশিত হয় I

ধীরে ধীরে ন্যানোটেকনোলজির গবেষণা ক্ষেত্র বিকশিত হয়ে চলেছে I আমেরিকার ফেডারেল এজেন্সির সহায়তায় 2001 সালে স্থাপিত হয় National Nanotechnology Initiative (NNI), যার মূল উদ্দেশ্য হল ন্যানোটেকনোলজির গবেষণায় বিশ্বব্যপী বিজ্ঞানী সমাজকে একেই ছাতার নীচে এনে ন্যানোটেকনোলজির ক্ষেত্রকে আরো সুদৃঢ় করে তোলা I আর এর জন্য প্রতিবছর 1 লক্ষ মার্কিন ডলার অনুমোদন করা হয় I এই গবেষণা কর্মসূচিকে ভবিষ্যতে আরো সরল করতে 2004 সালে তৎকালীন প্রেসিডেন্ট বুশ ’21st Century Nanotechnology Research and Development Act’ এ হস্তাক্ষর করেন I এখান দেখার বিষয় একবিংশ শতকের আগামীতে ন্যানোটেকনোলজি দুনিয়ার বিবর্তনে কিভাবে তার ভূমিকা পালন করে I হয়তো বা ‘বিন্দুতে সিন্ধু দর্শণ’ প্রবাদ বাক্যের বাস্তবায়নের দিন আসতে চলেছে বিজ্ঞানের এই নুতন দ্বার দিয়েই I

তথ্যসূত্রঃ ইন্টারনেট।।
লেখকঃ গোপাল মণ্ডল।।

আরও দেখুন “ভূগোলের জিকে ভাণ্ডার।। প্রতিদিন GK-র ২০টি প্রশ্ন ও উত্তর।। পর্ব-১”

এখান থেকে শেয়ার করুন
  • 48
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
    48
    Shares

Leave a Reply

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

error: মিশন জিওগ্রাফি ইন্ডিয়া কর্তৃক সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত