‘দাঁড়াও পথিকবর,……..তিষ্ঠ ক্ষণকাল’

প্রিয় পাঠক, আজ আমি প্রবন্ধের কারণে প্রবন্ধ লিখতে বসি নি। আজ ছোট্ট একটি গল্প বলে ভূগোল ও পরিবেশের নৈতিক শিক্ষা আর ভূগোল যে বিজ্ঞানের অন্যতম শাখা তা তুলে ধরার চেষ্টা করব। আমরা এখন হোম কোয়ারান্টাইন বিষয়ে মোটামুটি শিক্ষিত, অদৃশ্য করোনা ভাইরাসের উৎপাতে। আমি গত ছয়মাস ধরে হোম কোয়ারান্টাইনে আছি আমার কঠিন অসুখের জন্য। এখন আমি আবার সুস্থ হতে বসেছি। কিন্তু এই অসুস্থতার সময় আমি ভূগোলের এক দর্শনের সাথে আমার মার্গের মিল খুঁজে পেলাম। সেটা হল, আমার যখন ক্যান্সার ধরা পড়ে, তখন চিকিৎসক সবকিছু চেক করে ক্যান্সার হবার কোন কারণ বের করতে পারলেন না, না আমি ধূমপান, মদ্যপান বা অনিয়ন্ত্রিত জীবনযাপন কোনদিন করি নি যেগুলি এই রোগের অন্যতম কারণ বলে ধরা হয়ে থাকে। শেষে বিশেষজ্ঞরা বললেন, অতিরিক্ত পরিশ্রমে আপনার দেহের অনাক্রমতা কমে যাওয়ার কারণে এমন ঘটেছে। আমিও মনে মনে ভাবলাম, যে গত কয়েকবছর ধরে যশ, খ্যাতি, প্রতিষ্ঠা আর প্রতিযোগিতার বাজারে নিজেকে যোগ্যতমের উদ্বর্তন ঘটাতে গিয়ে সত্যি সত্যি নিজের দিকে খেয়াল করি নি। ভূগোলের ছাত্র হয়ে গ্রিফিথ টেলরের সেই নবনিয়ন্ত্রনবাদ নিজের জীবনে কোনদিন অনুভব করি নি। কোনদিন থামি নি বিশ্রাম নেবার জন্য বা ভাবি নি আগামীর পথ পাড়ি দেবার জন্য। কিন্তু সেই দর্শনে আপনি যদি নিজে না থামেন, তাহলে প্রকৃতির নিয়মে প্রকৃতি আপনাকে বাধ্যতামূলকভাবে থামাবেই, অথবা আপনার গন্তব্য স্বল্প দুরত্ব হয়ে দাঁড়াবে। ঠিক তেমনভাবে একটা সভ্যতার উন্নয়ন ঘটাতে হলে মাঝে মাঝে থামতে হয়, ভাবতে হয়। ‘স্টপ এণ্ড গো’ নীতি নিয়ে চলতে হয়। নইলে ধ্বংসের পথ নিজেরাই পরিষ্কার করে ফেলি। আমাদেরকে শিখতে হবে ঠিক কোথায় কত সময়ের জন্য থামতে হবে। মনে রাখবেন অনেক দূরের যাত্রা হলে তার গতি প্রথমদিকে কম রাখতে হয়, যেমন হাওড়া থেকে কন্যাকুমারীতে যে ট্রেন যাবে সে ট্রেন প্ল্যাটফর্ম ছেড়ে বেরোতে যথেষ্ট সময় নেবে, কিন্তু লোকাল ট্রেন হেঁচকি টান দিয়ে স্টেশন ছেড়ে বেরিয়ে যায়। বেশী দূর যেতে হলে মাঝে মাঝে গতি কমিয়ে ভাবুন।

বর্তমান পৃথিবীর এক জ্বলন্ত সমস্যায় জর্জরিত হয়ে আমরা অবিরাম ধারায় পথ হাঁটতে হাঁটতে দৌড়াতে শুরু করেছি একের পর এক গন্তব্য স্থির করে। তাই আমরা ভুলে গেছি মানুষ পরিবেশের সেই আত্মিক বন্ধনের কথা। ভুলে গেছি আমাদের সীমাবদ্ধতার কথা। আমরা ভুলে গেছি আমাদের থামার কথা, কিংবা আগামীর পথ নিয়ে আমাদের একটু ভাবনা করার কথা। উন্নয়ন আর অহমিকার মাঝে মানুষের মাঝে একটাই বিষয় প্রতিপন্ন হয়ে আসছে কালের ক্রমবিবর্তনের নিরবিচ্ছিন্ন ধারায়, আর তা হল প্রতিযোগিতা। মানুষে মানুষে প্রতিযোগিতা, জাতিতে জাতিতে, বর্ণে ধর্মে সবেতেই বিশ্বজুড়ে চলছে ইঁদুর দৌড়ের লড়াই। এমনকি মানুষ এই প্রতিযোগিতায় জেতার জন্য বারেবারে পরিবেশ প্রকৃতিকে করেছে হাতিয়ার। ফলস্বরূপ, ধেয়ে এসেছে একের পর এক বিপর্যয়। মনে রাখতে হবে পৃথিবীর বুকে ঘটে যাওয়া বিপর্যয়ের বেশীরভাগ ঘটনা মানুষের ভুলের কারণে ঘটেছে। তাই সভ্যতার বিকাশে মানুষ প্রকৃতিকে বলি করার কারণে মানুষ যখন নিজেকে সর্বনিয়ন্তা বলে ভেবে নিয়েছেন, ঠিক তখন এমন এক অবাঞ্ছিত সমস্যার মধ্যে পড়তে হয়েছে। তাই মানুষকে দীর্ঘ পথ পাড়ি দিতে গেলে থামতে হয় ক্ষণেকের জন্য। পরিবেশকে নিয়ন্ত্রন করতে করতে মানুষ যখন তাকে পূর্ণভাবে অস্বীকার করতে শুরু করে, ঠিক তখন পরিবেশ সবার অজান্তে বসে পড়ে চালকের আসনে। এখানেই তো পরিবেশগত নিয়ন্ত্রনবাদের সাফল্য। এলেন সেম্পেলের সেই উক্তি, ‘Man is the product of the earth’s surface. This means not merely that he is a child of the earth,- dust of her dust; but the earth has mothered him, fed him, set to task, directed his thoughts….’। মানুষের উপর প্রকৃতির পূর্ণ নিয়ন্ত্রন আর নেই। অন্তত সভ্যতার অগ্রগতির সাথে সাথে মানুষ বিজ্ঞানের বলে বলীয়ান হওয়ার পর মানুষ প্রকৃতিকে নিয়ন্ত্রন করছে, মানুষই চালকের আসনে। একটা সময় যখন নুন আনতে পান্তা ফুরানোর অবস্থা যাঁদের ছিল তাঁরা তখন প্রকৃতির সাথে হাতে হাত মিলিয়ে পাশাপাশি সহাবস্থান করেছে কিন্তু আজ যখন তাঁদের হাতে একটু পয়সা এসেছে, আজ তাঁরা আর বন্যায় ভাসতে চায় না, বৃষ্টি বাজ মাথায় করে মাঠে চাষ করতে যায় না। নিজের বাসা আগের থেকে শক্তপোক্ত করে বানিয়ে নিয়ে প্রকৃতির এই দাম্ভিকতাকে ছাপিয়ে নিজের অহমিকা প্রকাশে ব্যস্ত মানুষ।

একটা সময় গ্রামের সেই খড়ের চালা কিংবা মাটির দেওয়াল বেয়ে টপটপ করে বাড়ির ছাউনি থেকে বৃষ্টি পড়ত ফাইনাল সিটের উপর আর ভূগোলের ছাত্রদের শরীর থেকে এক একটা হাড় খসে পড়ার মতো হা হুতাশ করত, সেই সময় কিন্তু এতবড় প্রকৃতির নির্মম খেলার সাক্ষী কেউ হয়েছে বলে মনে হল না। সেসব এখন ইতিহাস, সময় বদলে গেছে। পরিবেশ ও প্রকৃতিকে বৃদ্ধাঙ্গুষ্ঠ দেখিয়ে আজ বিরাট অট্টালিকা বানিয়ে মানুষ মনে মনে ভেবেছিল এবার প্রকৃতিকে করবে নিয়ন্ত্রন। কিন্তু না, সম্ভাবনাবাদকে ছুঁড়ে দিয়ে শুরু হল পরিবেশগত নিয়ন্ত্রনবাদের তত্ত্ব। হাড়ে হাড়ে বুঝলাম যে প্রকৃতি শুধু আমাদের সামনে কিছু সম্ভাবনার দ্বার উন্মোচন করেন না, যে কোন মুহূর্তে সকল সম্ভাবনার বিনাশ ঘটাতে পারে। মানুষ তখন প্রকৃতির দোহাই দিতে লজ্জা পায়, কারন ততক্ষণে প্রকৃতিকে অস্বীকার করে নিজেই চালকের আসনে বসে পড়েছে। তাই প্রকৃতিকে তার মত করে চলতে দিতে হবে। নইলে পরিশেষে আমাদের বিপাকে পড়তে হবে।

আজ খুব মনে পড়ে যাচ্ছে হালিম মিঞার একটা গান, ‘মরা নদীর চরে, সাপের মাথায় ব্যাঙের নাচন, ময়ূর কেন নাচে রে…’। এই গান শোনার পর বিজ্ঞানের ছাত্ররা মনে করবে এটা আবার কীরূপে সম্ভব। কারণ খাদ্যশৃঙ্খলে এই তিন প্রাণী খাদ্য খাদক সম্পর্কে সাজানো। তার পরেও এমন ঘটে কীরূপ। হালিম মিঞার এই গান দেহ তত্ত্বের হলেও বর্তমানে মানুষের নির্মম দাপাদাপিতে এমনটাই হতে চলেছে। সবকিছু উল্টে যেতে বসেছে। সভ্যতার বিকাশের হাত ধরে আজ পাতালরেলও আকাশে উড়ছে, মিষ্টি আবার সুগার ফ্রি ইত্যাদি। কিন্তু এসকল হল মানুষ পরিবেশের যে সম্পর্ক সেই সম্পর্কের বিনাশ সাধনের উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত। আপনারা নিজের চোখের সামনে দেখবেন, যে বিড়াল একসময় কুকুর দেখলে নিকটবর্তী গাছেও উঠে যেত (যে কারণে বাগধারা এসেছিল ‘ঠেলায় বিড়াল গাছে ওঠে), সেই বিড়ালের সাথে কুকুর খাবার শেয়ার করছে। কারণ, বর্তমান পৃথিবীতে যখন পরিবেশ বিপন্ন হয়ে পড়ে তখন এই সকল প্রাণীদের পারস্পরিক সহাবস্থান পরিলক্ষিত হয়।
তথাকথিত উন্নয়নের মাঝে মানুষ অন্ধ হতে বসে। আজকের দিনের সবথেকে বর বিপর্যয়ের দিকে তাকালে দেখতে পাওয়া যাবে, যে করোনা সংক্রমণের হার বা মৃত্যুর পরিসংখ্যান বেশী উন্নত দুনিয়াতে। আর উন্নয়নশীল বা অনুন্নত দেশে যতটুকু বিস্তার লাভ করেছে তা এই উন্নত সভ্যতার উন্নত প্রজাতির দাপাদাপিতে ছড়িয়েছে। যারা প্রকৃতির সন্তান, প্রকৃতিকে মায়ের সমান দেখে আরাধনা করে প্রকৃতি মায়ের কোলে অবস্থান করে থাকে তাঁদের কোনদিন এই ধরণের বিপর্যয়ে কোনরূপ ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হয় নি। ইতিহাস সাক্ষী আছে, চেন্নাইয়ের মেরিনা বিচে উন্নত দুনিয়ার মানুষ সুনামিতে মরলেও আন্দামানের জারোয়া, সেন্টিনেল উপজাতি কিন্তু এতে ক্ষতিগ্রস্ত হন নি। তাঁদের প্রকৃতির সাথে অভিযোজন হয়ে গেছে, তাই তাঁরা প্রকৃতির নাড়ীর টান অনুভব করেন। বিপদের সঙ্কেত বুঝতে পেরে অনেক আগেই সাবধান হয়ে পড়েন। একদিন সভ্যতার আকাশে ঘন কালো মেঘ দেখা দিলে তখন সভ্যদুনিয়া এই অসভ্য(?) উপজাতিদের সংস্কৃতিকে বিজ্ঞানের সভ্য পরিচ্ছেদ বলে স্বীকার করতে বাধ্য হবে। আর সেখানেই প্রকৃতির কাছে মানুষের মাথা নত করা হবে। ভূগোলের যে দর্শন মানুষের নিয়ন্ত্রন সরিয়ে পরিবেশগত নিয়ন্ত্রনের কথা জোর দিয়ে বলেছেন তা সকল বিজ্ঞান যখন কাজ করে না, তখন সেই দর্শন ক্রিয়াশীল থাকে। কারণ তা চিরশ্বাশ্বত। সমাজবিজ্ঞানের এই শাখা প্রমান দেয় পাহাড়ে, জঙ্গলে, মরুতে, মেরুসহ এই বিশ্ব প্রপঞ্চের যত দুর্গম স্থানে যে সকল মানুষের বাস তাঁরা কিন্তু আধুনিক বিজ্ঞানের কোন আবিস্কারের ধার ধারে না। তবে তাঁদের কাছে এই ‘স্টপ এণ্ড গো’ তত্ত্ব একেবারে বৈদিক সত্য বলে মান্য করে থাকে। আমাদের বিজ্ঞান ঈশ্বর বিশ্বাস না করলেও তাঁরা করেন। কারণ বিজ্ঞানের যেখানে সীমারেখা থাকে সেখান থেকে ঈশ্বরের অবস্থান খোঁজা শুরু। আজকের এই বিপদ থেকে মুক্তি পাওয়া নয়, আগামীতে এমন বিপদের সৃষ্টি যাতে না হয় সেই দর্শন লুকিয়ে আছে আমাদের ভূগোলের দর্শনে। তাই এর থেকে বড় বিজ্ঞান জীবনচর্চাতে আর হয় না বলে মনে করি।

মানুষের গায়ে যতক্ষন জোর ততক্ষণ আমিই সব, যেই ঘায়েল হয়ে পড়ে তখন বিজ্ঞান ছেড়ে চিরাচরিত চিন্তাধারায় প্রবেশ করতে হলেও হোক। মনে রাখবেন মনুষ্যসৃষ্ট বিপর্যয়ে প্রকৃতির দোষ দিয়ে লাভ নেই, প্রকৃতির নিজের নিয়মে ঘটে চলা বিপর্যয় থামানোর দায়িত্ব প্রাকৃতিক বিজ্ঞানের নিয়মে হয়। তাই মানুষের লোভকে সংবরণ করে পরবর্তী প্রজন্মের জন্য সম্পদের সংরক্ষন করে যেতে হবে, স্থিতিশীল উন্নয়ন (Sustainable Development) এর কথা ভাবতে হবে। সময় এসেছে গান্ধীজীর সেই “The world has enough for everyone’s need, but not enough for everyone’s greed”। নইলে আমাদের আফসোস করে বলতে হবে, যে আমরা ভালোবেসে এক হতে পারি নি, আজ মৃত্যু ভয়ে সবাই মিলে গেছি। সাদা কালো, পূর্ব পশ্চিম, ধনী গরীব, ছোট বড়, উচ্চ নীচ সবাই আজ এক ছাদের তলায় নিয়ন্ত্রিত। সবাই মিলিত হয়েছে এক বিশ্বজোড়া কোয়ারান্টাইনের আঙ্গিনায়। যে প্রকৃতিকে সংহার করে এসেছি, আজ সেই প্রকৃতি থেকে মুখ লুকিয়ে সবাই ঘরের মধ্যে আবদ্ধ হয়ে ভাবছি। এভাবেই মানুষের আসবে সংযম। পৃথিবী আবার নতুন করে ফিরে পাবে তার হারানো পরিবেশ। কলকল করতে থাকবে জীবমণ্ডল। তাই বন্ধু, যাত্রা চলাকালীন একবার থামুন, ভাবুন তারপরে আবার যাত্রা শুরু করুন। মনে করুন আপনার অবিরাম চলার পথে কে যেন ট্রাফিক সিগন্যাল দিয়ে রেখেছেন। নৈতিকতার সিগন্যাল। মেনে চলুন, ভালো থাকুন আর ভালো রাখুন।

লেখকঃ- সনৎকুমার পুরকাইত (ডায়মন্ডহারবার, দঃ ২৪ পরগণা)
[লেখক রায়দিঘি কলেজের ভূগোল বিভাগের সহকারী অধ্যাপক]
প্রথম প্রকাশঃ ভূগোলিকা ফেসবুক পেজ, তৃতীয় বর্ষপূর্তি-৩০/০৩/২০২০

©ভূগোলিকা-Bhugolika
©মিশন জিওগ্রাফি ইন্ডিয়া

Content Protection by DMCA.com
এখান থেকে শেয়ার করুন
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  

সনৎকুমার পুরকাইত

সহকারী অধ্যাপক, ভূগোল বিভাগ, রায়দিঘি কলেজ, কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়

মন্তব্য করুন

error: মিশন জিওগ্রাফি ইন্ডিয়া কর্তৃক সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত