ভারতের উচ্চতম রেলস্টেশন ‘ঘুম’

রেলপথ হল ভারতের পরিবহণ ব্যবস্থার জীবনরেখা। দৈর্ঘ্য অনুসারে, ভারতের রেলপথ পৃথিবীর চতুর্থ বৃহত্তম রেলপথ ব্যবস্থা। ভারতীয় রেলপথে ২০০০ মিটার বা তার অধিক উচ্চতাযুক্ত ৭ টি স্টেশন রয়েছে। এগুলি হল — ঘুম (পশ্চিমবঙ্গ, ২২৫৮ মিটার), লাভডালে (তামিলনাড়ু, ২২১১ মিটার), উটি (তামিলানাড়ু, ২২০৩ মিটার), কেত্তি (তামিলনাড়ু, ২১০৩ মিটার), দার্জিলিং (পশ্চিমবঙ্গ, ২০৭৬ মিটার), সিমলা (হিমাচল প্রদেশ, ২০৭৫ মিটার), সামার হিল (হিমাচল প্রদেশ, ২০৪২ মিটার)। এদের মধ্যে ঘুম হল ভারতের উচ্চতম রেলস্টেশন। পশ্চিমবঙ্গের দার্জিলিং জেলাতে অবস্থিত ঘুম রেলস্টেশনের উচ্চতা হল ২২৫৭.৬ মিটার বা ৭৪০৭ ফুট। প্রশাসনিক দিক থেকে ঘুম গোর্খাল্যান্ড টেরিটোরিয়াল অ্যাডমিনিস্ট্রেশন (GTA) স্বায়ত্তশাসিত জেলা পরিষদের এবং দার্জিলিং পুরসভার ১ নং ওয়ার্ডের অন্তর্গত।

১৮৮১ সালের ৪ ঠা এপ্রিল ঘুম পর্যন্ত রেলপথ নির্মিত হয়। ১৮৯১ সালে ঘুম রেলস্টেশনটি গড়ে ওঠে। ঘুম রেলস্টেশনে ২টি প্ল্যাটফর্ম রয়েছে। ঘুম রেলস্টেশনটি দার্জিলিং হিমালয়ান রেলপথ (DHR) -এর অন্তর্গত, যা একটি ইউনেস্কো ওয়ার্ল্ড হেরিটেজ সাইট। ১৯৯৯ সালের ডিসেম্বরে দার্জিলিং হিমালয়ান রেলপথ (DHR) ইউনেস্কো ওয়ার্ল্ড হেরিটেজ সাইটের মর্যাদা লাভ করে। ঘুম রেলস্টেশন সহ সমগ্র দার্জিলিং হিমালয়ান রেলপথটি ন্যারোগেজ রেলপথ (২ ফুট ৬১০ মিমি)। এই রেলপথে চলাচলকারী ট্রেন ‘টয় ট্রেন’ নামে পরিচিত। দার্জিলিং শহর থেকে ঘুমের দূরত্ব মাত্র ৬ কিমি।

ঘুম রেলস্টেশনের পাশেই রয়েছে দার্জিলিং হিমালয়ান রেলওয়ে মিউজিয়াম। ২০০০ সালে এই মিউজিয়ামটি স্থাপিত হয়। রেলের ইতিহাসে আগ্রহী যারা, তাদের জন্য এই মিউজিয়াম অবশ্যই দ্রষ্টব্য। এখানে দার্জিলিং হিমালয়ান রেলপথের প্রাচীনতম ইঞ্জিন ‘বেবি সিভক’-এর দেখা মিলবে। এছাড়াও রয়েছে রেলগাড়ির কিছু পুরানো কলকব্জা আর বেশ কিছু বিরল ছবি। দার্জিলিং হিমালয়ান রেলপথের দার্জিলিং-ঘুমের মধ্যবর্তী অংশে ‘বাতাসিয়া লুপ’ একটি জনপ্রিয় পর্যটনকেন্দ্র।

ঘুমের আরেকটি দর্শনীয় স্থল ‘ঘুম মনাস্ট্রি’ বা ‘Yiga Choeling Gompa’। ঘুম রেলস্টেশন থেকে এই মনাস্ট্রির দূরত্ব মাত্র ০.৭ কিমি। এটি ১৮৭৫ সালে লামা শেরাব গ্যাৎসো কর্তৃক নির্মিত হয়েছিল। এখানে মৈত্রেয় বুদ্ধের মূর্তি রয়েছে। এছাড়াও ঘুমে আরও ৩ টি মনাস্ট্রি রয়েছে — সামতেন চোয়েলিং, শাক্য চোয়েলিং ও ফিন। ঘুমের স্ট্রিট ফুড বেশ জনপ্রিয়। ঘুম থেকে মাত্র ৩ কিমি দূরে রয়েছে সেঞ্চল হ্রদ। তাই, ভারতের উচ্চতম রেলস্টেশন ঘুম এবং আশেপাশের পর্যটনস্থলগুলি ভ্রমণে ২-১ দিন কাটাতেই পারেন ঘুমে। এজন্য ঘুম মনাস্ট্রি এবং বেশ কয়েকটি হোম-স্টে রয়েছে।

আর কতদিন ঘুম ভারতের উচ্চতম রেলস্টেশন থাকবে? ভারতীয় রেল মন্ত্রক বিলাসপুর-লেহ রেলপথের পরিকল্পনা ঘোষণার সাথে সাথে এ প্রশ্নটাও জেগে উঠেছে। হিমাচল প্রদেশের বিলাসপুর থেকে লাদাখের লেহ পর্যন্ত ৪৫৮ কিমি দৈর্ঘ্যের রেলপথ নির্মাণ প্রকল্প গৃহীত হয়েছে। এই রেলপথ নির্মিত হলে, তা হবে ভারত এবং বিশ্বের উচ্চতম রেলপথ। আর বিলাসপুর-লেহ রেলপথের অন্তর্গত লাদাখের তাগলাং লা রেলস্টেশন (উচ্চতা ৫৩৫৯ মিটার) ভারত এবং পৃথিবীর উচ্চতম রেলস্টেশনের মর্যাদা লাভ করবে। সীমান্তবর্তী এই রেলপথ প্রকল্পের জন্য ইতিমধ্যেই জমি অধিগ্রহণ চলছে। তাই, আগামী কয়েক বছরে ঘুম রেলস্টেশন ‘ভারতের উচ্চতম রেলস্টেশন’ -এর তকমা হারাবে, একথা বলাই যায়। তবে টয়ট্রেনের হুইসেলে, মেঘ-কুয়াশার লুকোচুরি খেলাতে ঘুম রেলস্টেশন চিরকালই ভ্রমণপিপাসুদের কাছে নস্টালজিক হয়ে থাকবে।


লেখিকাঃ- দেবিকা হালদার (জলঙ্গি, মুর্শিদাবাদ)
[লেখিকা কল্যাণী বিশ্ববিদ্যালয়ের ভূগোল স্নাতকোত্তর বিভাগের ছাত্রী]

তথ্যসূত্রঃ- Darjeeling Himalayan Railway (DHR) ; Indiarailinfo/Indian Railway ; Wikipedia ; North Bengal Tourism/Govt. of West Bengal ; Tripoto ; Guide to Darjeeling Area – A.P. Agarwala, A.P. (editor) 27th edition ; Darjeeling District Profile/Govt. of West Bengal

©ভূগোলিকা-Bhugolika
©Mission Geography India

Content Protection by DMCA.com
এখান থেকে শেয়ার করুন
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  

মন্তব্য করুন

error: মিশন জিওগ্রাফি ইন্ডিয়া কর্তৃক সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত