পূর্ব বর্ধমানের ঐতিহ্যপূর্ণ স্থান রমনাবাগান: একটি বন্যপ্রাণ অভয়ারণ্য

জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণের প্রধানত দুটি পদ্ধতি রয়েছে — (১) ইন সিটু সংরক্ষণ (২) এক্স সিটু সংরক্ষণ। ইন সিটু সংরক্ষণ বলতে বোঝায় এক বা একাধিক জীব প্রজাতিকে তার নিজস্ব প্রাকৃতিক পরিবেশের মধ্যে রেখে সংরক্ষণ করা। অন্যদিকে সাধারণত অধিক বিপদগ্রস্ত ও বিপন্ন জীবপ্রজাতিকে নিজ বাসস্থান থেকে পৃথক করে কৃত্রিম পরিবেশের মধ্যে রেখে সংরক্ষণ করা হয় এক্স সিটু সংরক্ষণে। জাতীয় উদ্যান, বন্যপ্রাণী অভয়ারণ্য, সংরক্ষিত বনাঞ্চল হল ইন সিটু সংরক্ষণের উপায়। আবার চিড়িয়াখানা, বোটানিক্যাল গার্ডেন, জিন ভান্ডারের মাধ্যমে এক্স সিটু সংরক্ষণ করা হয়ে থাকে।

পশ্চিমবঙ্গের মোট ভৌগোলিক আয়তনের ১৪ শতাংশ বনাঞ্চল। এরমধ্যে সংরক্ষিত অঞ্চল হল মোট আয়তনের মাত্র ৪ শতাংশ। জাতীয় উদ্যানগুলি হল — সুন্দরবন, গরুমারা, বক্সা, জলদাপাড়া, নেওড়া ভ্যালি ও সিঙ্গলিলা। একমাত্র সংরক্ষিত বনাঞ্চল হল সুন্দরবন সংরক্ষিত বনাঞ্চল। মহানন্দা, বল্লভপুর, বেথুয়াডহরি, বিভূতিভূষণ, চাপড়ামারি, জোড়পোখরি, নরেন্দ্রপুর, রায়গঞ্জ, রমনাবাগান, লোথিয়ান দ্বীপ, সজনেখালি, হলিডে দ্বীপ, সেঞ্চল প্রভৃতি ১৫ টি বন্যপ্রাণ অভয়ারণ্য পশ্চিমবঙ্গে রয়েছে। এরমধ্যে রমনাবাগান বন্যপ্রাণ অভয়ারণ্যটি পূর্ব বর্ধমান জেলায় অবস্থিত, যা এখানকার গৌরব।

বন্যপ্রাণ অভয়ারণ্য (Wildlife Sanctuary) -এর কিছু বিশেষ বৈশিষ্ট্য লক্ষ্য করা যায় — (১) সাধারণত এগুলি প্রজাতি কেন্দ্রিক। (২) ভারতে এর আয়তন সাধারণত 500 থেকে এক হাজার বর্গ কিমি হয়ে থাকে। (৩) চতুর্সীমা থাকলেও তা অলঙ্ঘনীয় নয়। (৪) পর্যটনের অনুমোদন থাকে। (৫) মানুষের কার্যকলাপ নিয়ন্ত্রিত ভাবে পরিচালিত হয়। ভৌগোলিক স্থানাঙ্ক অনুসারে 23 ডিগ্রি 15 মিনিট 12 সেকেন্ড উত্তর ও 27 ডিগ্রি 51 মিনিট 4 সেকেন্ড পূর্বে অবস্থিত পূর্ব বর্ধমানের একমাত্র বন্যপ্রাণ অভয়ারণ্য হল ‘রমনাবাগান বন্যপ্রাণ অভয়ারণ্য’ (Ramnabagan Wildlife Sanctuary)। বর্ধমান শহরের রেল স্টেশন থেকে মাত্র চার কিমি দূরে এটি অবস্থিত। এই অভয়ারণ্যের মোট আয়তন ১৪ হেক্টর।

জনশ্রুতি হিসেবে জানা যায়, অতীতকালে রমনা ডাকাতকে ধরার জন্য তৎকালীন বর্ধমানের রাজারা এই এলাকার সবদিক ঘিরে এগুতে থাকেন এবং ডাকাতদল সেখান থেকে পালিয়ে যায়। তখন পুরো এলাকা রাজপরিবারের দখলে আসে। সেই থেকে রমনা ডাকাতের নাম অনুসারে এলাকাটি রমনাবাগান নামে পরিচিত হয়। ১৯৬০ সালে রমনাবাগান সংরক্ষিত অঞ্চল হিসেবে পরিচিত হয়। প্রথম প্রথম আশেপাশের অঞ্চলের আহত ও বিপদগ্রস্ত প্রাণীদের এখানে এনে রাখা হত। এতে দেখা যায়, হরিণের সংখ্যা প্রচুর পরিমাণে বৃদ্ধি পেয়েছে। বিভিন্ন প্রজাতির হরিণের মধ্যে চিত্রা, মায়া ও কৃষ্ণসার ছিল উল্লেখযোগ্য। এখান থেকেই রমনাবাগান ডিয়ার পার্ক নামে পরিচিত হয়। ১৯৭৮ সালে পুনরায় ডিয়ার পার্ক পূর্ববর্তী নামে ফিরে যায়। ১৯৮১ সালের সেপ্টেম্বর মাসে (G.O-4375/For.-11B-71/80) রমনাবাগান বন্যপ্রাণ অভয়ারণ্য হিসাবে স্বীকৃতি পায়। ১৯৮৮ সালের পরিসংখ্যান অনুসারে অন্যান্য প্রাণীদের পাশাপাশি এখানে ২৭ টি চিত্রা হরিণ, ৮ টি মায়া হরিণ ও ১ টি কৃষ্ণসার হরিণ ছিল। ২০০৮ সালে এটি মিনি জু হিসেবে পরিচিত হয়। বর্তমানে রমনাবাগান পূর্ব বর্ধমানের জেলা বনদপ্তর এর অধীনে রয়েছে। রমনাবাগান বন্যপ্রাণ অভয়ারণ্য গড়ে তোলার মূল উদ্দেশ্য হল — (১) মূলত গঙ্গা অববাহিকা অঞ্চলের বিভিন্ন প্রজাতির বন্যপ্রাণী সংরক্ষণ। (২) বিপদগ্রস্ত প্রাণী ও উদ্ভিদ প্রজাতি সহ প্রাকৃতিক পরিবেশের সুস্থায়ী সংরক্ষণ। পূর্ব বর্ধমান শহর সমভূমি অঞ্চলের অন্তর্গত। দামোদর, অজয়, ভাগীরথী নদীর অববাহিকা অঞ্চলের অন্তর্গত হয় এখানে পলিমাটি দেখতে পাওয়া যায়। মৌসুমী জলবায়ুর কারণে এখানকার বার্ষিক গড় উষ্ণতা 27 থেকে 35 ডিগ্রি সেলসিয়াস এবং গড় বৃষ্টিপাত 1400 মিলিমিটার। আদর্শ প্রাকৃতিক পরিবেশের কারণে রমনাবাগান বিভিন্ন জীবপ্রজাতির বসবাসের উপযোগী। তাই এখানে ইনসিটু জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণ সফল হয়েছে।

জীববৈচিত্র্যঃ- (১) উদ্ভিদ প্রজাতিঃ- রমনাবাগানের বিশাল চত্বরে বিভিন্ন প্রজাতির উদ্ভিদ দেখা যায়। শাল, সেগুন, জাম, কাঁঠাল প্রভৃতি সাধারণ উদ্ভিদ ছাড়াও বিভিন্ন দুর্লভ প্রজাতির বৃক্ষও রয়েছে। এখানে ক্রান্তীয় পর্ণমোচী জাতীয় বৃক্ষের প্রাধান্যই দেখা যায়। এগুলির যথেষ্ট প্রাচীন, কারণ বর্ধমানের রাজাদের আমলে এগুলি বসানো হয়েছিল। আকর্ষণীয় ব্যাপার এই যে, এখানে রয়েছে বহু পুরানো বৃক্ষের গুঁড়ির জীবাশ্ম যা সত্যি বিস্ময়কর। (২) প্রাণী প্রজাতিঃ- চিতল হরিণ ও অন্যান্য প্রজাতির হরিণ এখানে সবচেয়ে বেশি সংখ্যায় রয়েছে। এছাড়া কয়েকটি কুমীর, হনুমান, নানান ধরনের পাখি (যেমন – রাজহাঁস, পেঁচা ও কয়েক ধরনের পরিযায়ী পাখি) দেখা যায়। ২০০৭ সালের আগে এখানে চিতা বাঘ ও ভালুক ছিল। অবশ্য পরে সেগুলি মারা যায়।
২০১৪ সালের আগস্ট মাসে বোটানিক্যাল সার্ভে অফ ইন্ডিয়ার জেনারেল রণজিৎ সিংহের নেতৃত্বে পাঁচ সদস্যের এক প্রতিনিধি দল রমনাবাগানের প্রজাতি সংরক্ষণের উদ্দেশ্যে বর্ধমান বিশ্ববিদ্যালয়ের সাথে মৌ চুক্তি স্বাক্ষর করে। বর্ধমান বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্যের মতে “স্বাধীনতার পর রাজ্যে কোন বিশ্ববিদ্যালয়ের সাথে কেন্দ্রীয় গবেষণা মূলক সংস্থার সঙ্গে এমন চুক্তি আগে হয়নি”। এই সময় বর্ধমান বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক মহাশয় অম্বরীশ মুখোপাধ্যায় যে তথ্য তুলে ধরেন তা থেকে জানা যায়, রমনাবাগান ও আশেপাশের এলাকায় ১৫৪ টি প্রাচীন মেহগিনি ও ২০০ রকমের মাকড়সা রয়েছে। শুধু তাই নয় শীতের সময় নানান প্রজাতির পরিযায়ী পাখি এখানে এসে ভিড় জমায়।

সাম্প্রতিক কালে, গত কয়েক বছর ধরে রাজ্য বনদপ্তর রমনাবাগান অভয়ারণ্যের আকর্ষণ বৃদ্ধি করতে পুনঃনির্মাণের কাজ শুরু করেছেছে। ১০০ বিঘা জমির ওপর কাজ শুরু হয়েছে। নতুন গেট নির্মাণ, চারিদিক পরিষ্কার, দেয়ালে বিভিন্ন ধরনের পশু পাখির ছবি অঙ্কনের মাধ্যমে এখানকার সৌন্দর্য বৃদ্ধি করা হয়েছে। বর্তমানে রমনাবাগানের নাম দেওয়া হয়েছে “বর্ধমান জুলজিক্যাল পার্ক”। চিড়িয়াখানা তৈরিতে দেড় কোটি টাকা বরাদ্দ হয়েছে। বিভাগীয় বন আধিকারিক দেবাশীষ শর্মার বলেছেন যে, তাঁদের পক্ষ থেকে রমনাবাগানকে পূর্ণ চিড়িয়াখানায় রূপান্তরিত করার প্রস্তাব পাঠানো হয় সেন্ট্রাল অথোরিটির কাছে। পরে তাদের গাইডলাইন মেনে রাজ্য জু অথরিটি অনুমোদন দেয়। পশু-পাখিদের থাকার জন্য অনেক নতুন ‘এনক্লোজার’ তৈরি হয়েছে।
রমনাবাগানে এখন ‘কালী’ ও ‘ধ্রুব’ নামে দুটি চিতাবাঘ রয়েছে। এছাড়া চারটি ভালুক, কুমীর, দার্জিলিং থেকে একজোড়া গোল্ডেন ফিজ‍্যান্ট, একজোড়া চাইনিজ ফিজ‍্যান্ট আনা হয়েছে। আলিপুরদুয়ার থেকে দুজোড়া ময়ূর-ময়ূরী আনার পর বর্তমানে এদের মোট সংখ্যা ৫। এছাড়া রয়েছে এমু ও অন্যান্য পাখি। সুন্দরবন থেকে আরো কিছু কুমীর আনার বন্দোবস্ত করা হয়েছে। নেকড়ে ও হায়না নিয়ে আসার পরিকল্পনা চলছে।সজারু, বিভিন্ন প্রজাতির কচ্ছপও রমনাবাগানে এখন দেখা যায়। অন্যদিকে, মাছের জন্য মিনি অ্যাকুরিয়াম তৈরি ও একই সঙ্গে সর্প উদ্যান করার কথাও ভাবছেন বলে জানান রমনা বাগানের রেঞ্জ অফিসার তরুন বন্দোপাধ্যায়। পশু পাখিদের খাদ্য হিসাবে বিভিন্ন রকমের ফল, শস্যদানা, ডাল, দুধ, আলু, শাক, গাজর, মধু, চিকেন, মাটন দেওয়া হয়। এদের যত্ন নেওয়ার জন্য রয়েছে ৯ জন স্থায়ী ও অস্থায়ী কর্মীবৃন্দ। তবে আধিকারিকদের মতে বাড়তি নজরদারির জন্য আরো কিছু লোক প্রয়োজন। প্রতিদিন গড়ে ৫০০ জন পর্যটক এখানে আসেন।
বন্যপ্রাণী সংরক্ষণের ক্ষেত্রে পূর্ব বর্ধমানের রমনাবাগান এক গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে, তা বলাই বাহুল্য। পরিবেশ সংরক্ষণে, সুস্থায়ী উন্নয়নে, মানুষ-পরিবেশ সুসম্পর্ক বজায় রাখতে এই পদক্ষেপ প্রশংসনীয়। আমাদের সকলের সচেতনতা বৃদ্ধির মাধ্যমে বন্যপ্রাণী সংরক্ষণ সফল হয়ে উঠতে পারে সর্বত্রই। আমাদের এই কথা স্মরণে রাখতে হবে ‘সকলের তরে সকলে আমরা/ প্রত্যেকে আমরা পরের তরে’।

পথনির্দেশঃ- বর্ধমান রেলস্টেশন থেকে টোটো, বাস বা সাইকেল রিক্সা মাধ্যমে সহজেই রমনাবাগান পৌঁছানো যায়।
সময়সূচীঃ- বৃহস্পতিবার বাদে প্রতিদিন সকাল ১০ টা থেকে বিকাল ৫ টা পর্যন্ত।
প্রবেশ মূল্যঃ- ছোটদের ক্ষেত্রে ১০ টাকা ও বড়দের জন্য মাথাপিছু ১৫ টাকা।

লেখিকাঃ- সূচনা ব্যানার্জী (মসাগ্রাম, পূর্ব বর্ধমান)
তথ্যসূত্রঃ- রমনাবাগান কর্তৃপক্ষের সাক্ষাৎকার ; উইকিপিডিয়া ; বাংলাপিডিয়া ; Daily Hunt ; আনন্দবাজার পত্রিকা ; নিউজ ১৮ বাংলা ; এই সময় ; HillstationBoss.com
এডিটিং ও প্রচ্ছদ সহায়তাঃ- অরিজিৎ সিংহ মহাপাত্র (পার্শ্বলা, বাঁকুড়া)
প্রথম প্রকাশঃ ভূগোলিকা ফেসবুক পেজ, তৃতীয় বর্ষপূর্তি-৩০/০৩/২০২০

©ভূগোলিকা-Bhugolika
©মিশন জিওগ্রাফি ইন্ডিয়া

Content Protection by DMCA.com
এখান থেকে শেয়ার করুন
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  

সূচনা ব্যানার্জী

মসাগ্রাম, পূর্ব বর্ধমান

মন্তব্য করুন

error: মিশন জিওগ্রাফি ইন্ডিয়া কর্তৃক সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত