প্রসঙ্গ : নারীর ক্ষমতায়ন

“নারীর অনুমান পুরুষের নিশ্চয়তার চেয়ে অনেক বেশি নির্ভরযোগ্য”
– রুডইয়ার্ড কিপলিং (১৮৬৫-১৯৩৬)

নারীর ক্ষমতায়ন (Women’s Empowerment) হল নারীদের ক্ষমতায়নের প্রক্রিয়া। নারীর ক্ষমতায়ন বলতে বোঝায়, একজন নারীর নিজের জীবনকে নিয়ন্ত্রণ, নিজস্ব বিষয়গুলি নির্ধারণ, দক্ষতা অর্জন, আত্মবিশ্বাস বৃদ্ধি, যেকোনো সমস্যার সমাধান ও আত্মনির্ভরশীলতার সক্ষমতাকে। বর্তমানে পৃথিবীর কোনো দেশই লিঙ্গ বৈষম্য বা আর্থসামাজিক উন্নয়নে নারী-পুরুষের অংশগ্রহণের পার্থক্য সম্পূর্ণ রূপে বন্ধ করতে পারেনি। তাই, নারীর ক্ষমতায়ন হল নারীদের সম্পূর্ণ রূপে সামাজিক, অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক কাজে অংশগ্রহণকে সুনিশ্চিত করা। অর্থাৎ, নারীর ক্ষমতায়ন বলতে একধরনের অবস্থাকে বোঝায়, যে অবস্থায় নারী তার জীবনের সঙ্গে সম্পর্কিত প্রতিটি ক্ষেত্রে স্বাধীন ও মর্যাদাকর অবস্থায় উন্নীত হতে পারে। বর্তমান সময়ে নারীর ক্ষমতায়ন উন্নয়ন এবং অর্থনীতিতে একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হয়ে উঠেছে। নারীর ক্ষমতায়ন হল লিঙ্গ সাম্যতার প্রতিচ্ছবি, যা স্থিতিশীল উন্নয়নের লক্ষ্যে বিশেষ প্রয়োজনীয়।

নারী ক্ষমতায়নের প্রধান উদ্দেশ্যগুলি হল — (১) সকল স্তরে নারী ও মেয়েদের বিরুদ্ধে সমস্তপ্রকার বৈষম্য দূর করা। (২) সর্বজনীন ও ব্যক্তিগত পর্যায়ে নারী ও মেয়েদের বিরুদ্ধে সমস্তপ্রকার সহিংসতা (নারী পাচার, যৌন ও অন্যান্য সর্বপ্রকার শোষণ) দূর করা। (৩) সকল প্রকার অবৈতনিক গৃহস্থালির কাজ ও যত্নের স্বীকৃতি প্রদান ও মূল্যায়ন করা। (৪) রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক ও জনজীবনে সিদ্ধান্ত গ্রহণে নারীর পূর্ণ, কার্যকর অংশগ্রহণ এবং সমান সুযোগ সুনিশ্চিত করা। (৫) অর্থনৈতিক সম্পদে নারীর সমানাধিকার প্রদান করা। (৬) নারীদের বিরুদ্ধে সমস্তপ্রকার ক্ষতিকর কার্যক্রম (যেমন – অল্প বয়সে বিবাহ, জোর পূর্বক বিবাহ) বন্ধ করা। (৭) উত্তরাধিকার ও প্রাকৃতিক সম্পদের ওপর নারীর সমান নিয়ন্ত্রণ সুনিশ্চিত করা। (৮) যৌন ও প্রজনন স্বাস্থ্যের প্রতি নারীর নিয়ন্ত্রণ সুনিশ্চিত করা প্রভৃতি।

নারীর ক্ষমতায়নের অনেকগুলি প্রভাবক রয়েছে। এই মাপকাঠিগুলি দ্বারাই কোনো দেশের নারীর ক্ষমতায়নের অগ্রগতি বিচার করা হয়। এই প্রভাবকগুলি হল — অর্থনৈতিক কর্মে অংশগ্রহণ এবং সুযোগ ; আর্থিক স্বাধীনতা ; গৃহস্থালি ব্যবস্থাপনা ও পারিবারিক ক্ষেত্রে সিদ্ধান্ত গ্রহণ ; শিক্ষা এবং শিক্ষামূলক স্বাধীনতা ; প্রশাসনিক ও রাজনৈতিক অংশগ্রহণ ; সাংবিধানিক ও আইনগত অবস্থান ; স্বাস্থ্য সুরক্ষা ও পরিষেবা ; সমাজের মনস্তাত্ত্বিক ধাঁচ ; বৈবাহিক সম্পর্কের প্রভাব ; গণমাধ্যমের ভূমিকা প্রভৃতি। এই সকল প্রভাবকগুলি দ্বারা পরিমাপ করে, যেকোনো দেশে বা বর্তমান বিশ্বে নারীর ক্ষমতায়নের চালচিত্র কিরূপ তা নির্ধারণ করা যায়। সাধারণত ‘লিঙ্গ ক্ষমতায়ন পরিমাপ’ (Gender Empowerment Measure) দ্বারা নারীর ক্ষমতায়ন পরিমাপ করা হয়। এছাড়া এবিষয়ে লিঙ্গ অসাম্য সূচক (Gender Inequality Index), লিঙ্গ বৈষম্য সূচক (Gender Parity Index) এবং লিঙ্গ-সম্পর্কিত উন্নয়ন সূচক (Gender-related Development Index), গ্লোবাল জেন্ডার গ্যাপ ইন্ডেক্স উল্লেখ্য।

২০১৮ সালের ইউএনডিপি এর লিঙ্গ সম্পর্কিত উন্নয়ন সূচক (GDI) তালিকাতে কুয়েত প্রথম স্থানে এবং নাইজার শেষতম স্থানে রয়েছে। এই তালিকায় ভারত ১৫৩ তম স্থানে রয়েছে। অন্যদিকে, ২০১৯ সালের ইউএনডিপি লিঙ্গ অসাম্য সূচক (GII) তথ্যানুসারে, সর্বনিম্ন মান (০.০২৫) নিয়ে সুইৎজারল্যান্ড প্রথম স্থানে এবং সর্বোচ্চ মান (০.৭৯৫) নিয়ে ইয়েমেন শেষতম স্থানে রয়েছে। এই তালিকায় ভারত ০.৪৮৮ মান নিয়ে ১২৩ তম স্থানে রয়েছে। ওয়ার্ল্ড ইকোনমিক ফোরামের ২০২০ গ্লোবাল জেন্ডার গ্যাপ রিপোর্ট অনুসারে, ০.৮৭৭ মান নিয়ে আইসল্যান্ড প্রথম স্থানে এবং ০.৪৯৪ মান নিয়ে ইয়েমেন শেষতম স্থানে রয়েছে। এই তালিকায় ০.৬৬৮ মান নিয়ে ভারত ১১২ তম স্থানে রয়েছে। সাধারণত পশ্চিমা বিশ্বের উন্নত দেশগুলিতে নারীর ক্ষমতায়ন অনেক এগিয়ে রয়েছে। এশিয়া ও আফ্রিকার তৃতীয় বিশ্বের উন্নয়নশীল দেশগুলি এবিষয়ে অনেক পিছিয়ে রয়েছে। বিশ্বব্যাপী নারীর ক্ষমতায়ন প্রসারে রাষ্ট্রসংঘের ভূমিকা বিশেষ উল্লেখযোগ্য। রাষ্ট্রসংঘ ১৯৭৫ সালকে ‘আন্তর্জাতিক নারী বর্ষ’, ১৯৭৫-৮৫ দশককে ‘আন্তর্জাতিক নারী দশক’ এবং ১৯৭৫ সাল থেকে প্রতিবছর ৮ ই মার্চকে ‘আন্তর্জাতিক নারী দিবস’ রূপে ঘোষণা করে। ১৯৭৫ সালে রাষ্ট্রসংঘের তত্ত্বাবধানে মেক্সিকোর মেক্সিকো সিটিতে সর্বপ্রথম বিশ্ব নারী সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয়।

বর্তমান সময়ে পরিবর্তন এসেছে নারীর অবস্থা ও অবস্থানে। সমাজের প্রায় সব ক্ষেত্রেই নারীর অংশগ্রহণ দৃশ্যমান হচ্ছে। রাজনীতি, অর্থনীতি, প্রশাসন, সামরিক বাহিনী — সর্বত্রই নারীর অংশগ্রহণ ক্রমবর্ধমান। কিন্তু কিছু কারণবশত, আজও বিশ্বের একটি বৃহত্তর অংশ নারীর কাঙ্ক্ষিত ক্ষমতায়ন অর্জনে সফল হয়নি। এই কারণগুলি নারীর ক্ষমতায়নে বাধা রূপে পরিচিত। এগুলি হল — বৈষম্যমূলক সামাজিক নিয়ম ও সংস্কৃতি ; লিঙ্গ পক্ষপাতদুষ্ট আইন এবং নিয়ন্ত্রক পরিবেশ ; শিক্ষা ও স্বাস্থ্য ক্ষেত্রে নারীর সীমিত অধিগমন ; কর্মস্থলে বেতনসহ বিভিন্ন প্রকার বৈষম্য ; নারীর প্রতি সহিংসতা ; নারী নিরাপত্তার অভাব ; নারীর অধিকার ও ক্ষমতায়ন সম্পর্কে সচেতনতার অভাব প্রভৃতি।

নারীর ক্ষমতায়নে সবার প্রথমে নারীদেরই এগিয়ে আসতে হবে। নারীরা নিজ অধিকার সম্পর্কে সচেতন না হলে, প্রকৃত ক্ষমতায়ন কার্যত অসম্ভব। শিক্ষা, স্বাস্থ্য, প্রশিক্ষণ, মানসিক ও সাংস্কৃতিক বিকাশের মাধ্যমে নারীকে দক্ষ মানবসম্পদে রূপান্তর করা দরকার। রাজনৈতিক ও আর্থসামাজিক ক্ষেত্রে নারীদের আরও ব্যাপক হারে অংশগ্রহণ করা প্রয়োজন। নারীর প্রতি সকলপ্রকার সামাজিক বৈষম্য দূর করতে, নারীর প্রতি সকলপ্রকার নির্যাতন ও সহিংসতা দূর করতে উপযুক্ত সরকারি নীতি গ্রহণ করা আবশ্যক। মা, বোন, স্ত্রী, কন্যা — জগৎ সংসারে নারী কতই না গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকায় অবতীর্ণ হয়। নারীরা সমাজের অর্ধেক অংশ। তাই নারীদের প্রতিভা ও স্বয়ংসম্পূর্ণ বিকাশের সুযোগ নিশ্চিত করা রাষ্ট্র ও সমগ্র সমাজের দায়িত্ব ও পরম কর্তব্য। পরিশেষে, চেতনার স্ফূরণে সতত উজ্জ্বল কবি কাজী নজরুল ইসলামকে উদ্ধৃত করে বলতে চাই —
“বিশ্বে যা কিছু মহান সৃষ্টি চিরকল্যাণকর,
অর্ধেক তার করিয়াছে নারী, অর্ধেক তার নর।”


লেখিকাঃ- দেবিকা হালদার (জলঙ্গি, মুর্শিদাবাদ)
[লেখিকা কল্যাণী বিশ্ববিদ্যালয়ের ভূগোল স্নাতকোত্তর বিভাগের ছাত্রী]

তথ্যসূত্রঃ- উইমেন অ্যান্ড আইটিসি ফ্রন্টিয়ার / নারীর ক্ষমতায়ন, এসডিজি এবং তথ্যপ্রযুক্তি / UN APCICT-ESCAP ; World Economic Forum – Global Gender Gap Report 2020 ; UNDP GDI Report 2018 ; UNDP GII Report 2019 ; যুগান্তর পত্রিকা ; Wikipedia

©ভূগোলিকা-Bhugolika
©Mission Geography India.

Content Protection by DMCA.com
এখান থেকে শেয়ার করুন
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  

মন্তব্য করুন

error: মিশন জিওগ্রাফি ইন্ডিয়া কর্তৃক সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত