মারণ ফাঁদ

‘মরিতে চাহিনা আমি সুন্দর ভুবনে,
মানবের মাঝে আমি বাঁচিবারে চাই।’

কবির এই আর্তি শুধুমাত্র কবির নয়, জগৎ সংসারের। মানুষ বাঁচার জন্য প্রতি নিয়ত লড়াই করে চলেছে। আমেরিকান সংস্থা Central Intelligence Agency (CIA) এর “The World Fact-book Life Expectancy” ২০১৬ অনুযায়ী বর্তমান বিশ্বে মানুষের গড় জীবদ্দশা ৬৯ বছর অন্যদিকে United Nations World Population Prospects ২০১৫ অনুযায়ী বিশ্বে মানুষের গড় আয়ু ৭২ বছর। এটা একটা গড় মানের সূচক, এর অর্থ এই নয় যে সকলেই এই দিন পর্যন্ত বেঁচে থাকবে। মাঝে মধ্যে প্রকৃতির বিষ নিশ্বাস মানুষের সমস্ত হিসাব-নিকাশ উল্টে পাল্টে দিয়ে নিজের ক্ষমতা প্রকাশ করে মানুষকে যথেচ্ছচার থেকে বিরত থাকার লাল সতর্কবার্তা জারি করে থাকে। মানুষ শক্তিশালী জীব হয়েও প্রকৃতির সেই বিষ নিশ্বাস থেকে বেরিয়ে আসতে পারে না। এরকম পরিস্থিতির উদাহরণ আমরা দেখেছি ১৭২০ সালে The Great Plague of Marseille রূপে, যেখানে প্রায় ১,০০,০০০ জীবনদীপ নিভে যায়। ১৮১৭-২৪ সালের Asiatic Cholera যেখানে হিসাব বহির্ভূত মৃত্যুমিছিল দেখেছে মানব সমাজ। ১৯১৮-২০ এর Influenza Pandemic বা The Spanish Flu যেখানে বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তের প্রায় ৫,০০,০০,০০০ মানুষের প্রাণ অকালে ঝরে যায়। পূর্ব প্রবণতা অনুসরণ করে এই শতকের ভয়ঙ্কর মৃত্যুমিছিল আরম্ভ হয়েছে বিশ্বজুড়ে। মানুষ মারণ ফাঁদে জড়িয়ে পড়ছে প্রতি মুহূর্তে।
“The only thing we have to fear on this planet is man” – সুইস মনোবিশেষজ্ঞ Carl Gustav Jung এর এই ভয়ার্ত উক্তি বর্তমানে বাস্তবায়িত হয়ে চলেছে। মানুষই মানুষ মারার যন্ত্রে পরিণত হয়ে গেছে। সভ্যতার চাকা স্তব্ধ হয়ে গেছে Lock Down নামক ছোট্ট শব্দবন্ধে। বিশ্বে ত্রাস উঁকি দিচ্ছে আনাচে-কানাচে। মৃত্যু মিছিল চলছে দুনিয়া জুড়ে। কেও বাদ পড়ছে না এই মিছিল থেকে। ধনী থেকে হত দরিদ্র, আবাল-বৃদ্ধ-বনিতা সকলেই মারণফাঁদে জড়িয়ে যাচ্ছে প্রতি মুহূর্তে। দৈনিক শব্দকোষে যুক্ত হয়েছে Lock Down, COVID-19, Social Distancing প্রভৃতি নানা নতুন নতুন শব্দবন্ধ। বিভিন্ন দেশের রাষ্ট্রনায়কের তীব্র সতর্ক আর্তি প্রতি মুহূর্তে অনুরণিত হয়ে চলেছে বিভিন্ন মাধ্যমে। বিশ্বে অচলাবস্থা, অর্থনীতি বিধ্বস্ত।

কেন এই অবস্থা, এই ভয়াবহ মারণ ফাঁদের সূচনাই বা কিভাবে? জানতে ইচ্ছা হচ্ছে? চলুন তাহলে একটু বিশ্ব পরিক্রমায় বেরিয়ে পড়ি। প্রথমেই আমরা চীনে পদার্পণ করি চলুন, যদিও চীন এখন মানুষের কাছে আতঙ্ক। চীনের নাম শুনলে এখন অনেকেরই বুক চিনচিন করে ওঠে। হ্যাঁ ২০১৯ এর শেষে ডিসেম্বর মাসে চীন থেকেই প্রথম Novel Coronavirus নামক বিশ্ব ত্রাসের সূচনা হয়। মধ্য চীনের হুবেই প্রদেশের রাজধানী উহান (Wuhan) শহর থেকে প্রথম এই ভাইরাসে আক্রান্ত রোগী চিহ্নিত হয় ২০২০ সালের ১০ ই জানুয়ারি। এর পর ধীরে ধীরে তা বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তে ছড়িয়ে পড়তে থাকে। করোনা ভাইরাস সংক্রমণের ভয়াবহতার দিকে লক্ষ্য রেখে World Health Organization (WHO) এর ডিরেক্টর জেনারেল Dr. Tedros Adhanom Ghebreyesus ১১ ই মার্চ ২০২০ তে Pandemic হিসাবে ঘোষণা করেন। ইতিমধ্যে ভাইরাসটি বিশ্ব পরিক্রমায় বেরিয়ে পড়েছে। ১২ ই জানুয়ারি চীন থেকে বেরিয়ে থাইল্যান্ডে আত্মপ্রকাশ করে করোনা ভাইরাস। এরপর ১৪ ই জানুয়ারি জাপান, ১৯ শে জানুয়ারি দঃ কোরিয়া, ২০ শে জানুয়ারি আমেরিকা যুক্তরাষ্ট্র, ২৩ জানুয়ারি ফ্রান্স, ২৬ শে জানুয়ারি জার্মানি, ২৯ শে জানুয়ারি ইতালি প্রভৃতি দেশে নিজের অস্তিত্বের জানান দেয়। একসময় ভারতের মাটিতেও পৌঁছে যায় এই ভাইরাস। ভারতের কেরালা রাজ্যে ৩০ শে জানুয়ারি প্রথম করোনা ভাইরাস সংক্রমণের তথ্য সামনে আসে। এভাবেই বর্তমানে বিশ্বের ১৯৯ টি দেশে ছড়িয়ে পড়েছে এই মারণ ফাঁদ। WORLDOMETER এর তথ্য (২৯ শে মার্চ ১০:২০ IST) অনুযায়ী ইতিমধ্যে বিশ্বে আক্রান্তের সংখ্যা ৬,৬৩,৯২৮ জন, যার মধ্যে মৃত্যু হয়েছে ৩০,৮৮২ জনের এবং সুস্থ হয়েছে ১,৪২,৩৬১ জন। বর্তমানে সক্রিয় সংক্রমিত মানুষের সংখ্যা প্রায় ৪,৯০,৬৮৫ জন।

বিশ্বে যখনই বিপদ ঘনীভূত হয়েছে তখন মানব বন্ধনে মানুষ সংঘবদ্ধ হয়ে সেই বিপদের মোকাবিলায় নেমে পড়েছে। বিশ্বের এই নতুন বিপদে মানব বন্ধন কার্যহীন, বরঞ্চ এর বিপরীত দিকে Social Distancing বা সামাজিক দূরত্ব ধারণাটির উদ্ভব হয়েছে। মানব বন্ধন বর্তমানে মারণ ফাঁদ। করোনা মহামারী সরাসরি এক দেহ থেকে অন্য দেহে দ্রুত সংক্রমিত হয়ে চলেছে। সংক্রমিত ব্যক্তির হাঁচি, কাশি বা মুখের লালা থেকে ভাইরাস নির্গত হয়ে দ্রুত ছড়িয়ে পড়ছে অন্যের দেহে। এই ভাইরাস বিপর্যয়ের চারটি পর্যায় চিহ্নিত হয়েছে, যথা, প্রথম পর্যায় — যেখান থেকে এর সূচনা, দ্বিতীয় পর্যায় — সরাসরি সংক্রমিত ব্যক্তি থেকে বা তার আশেপাশের বিভিন্ন জিনিস থেকে সংক্রমণ, তৃতীয় পর্যায় — সম্প্রদায় সঞ্চালন (Community Transmission) যেখানে এক সংক্রমিত ব্যক্তি থেকে তার নিকটবর্তী সকল ব্যক্তির মধ্যে দ্রুত সংক্রমণ ঘটে এবং চতুর্থ পর্যায় — যেখানে নিয়ন্ত্রণহীন অবস্থায় মৃত্যুমিছিল ও সভ্যতার ধ্বংস। কি, মামফোর্ডের নগর বিকাশের পর্যায় মনে পড়ে গেল নাকি ? স্বাভাবিক। প্রথম পর্যায় চীনেই সীমাবদ্ধ, দ্বিতীয় পর্যায় থেকে অন্য দেশে এই ভাইরাস কাজ করছে। চীনের মৃত্যু মিছিল দেখে বিভিন্ন দেশের নাগরিক আতঙ্কিত হয়ে নিজের নিজের দেশে ফিরতে থাকে এবং অধিকাংশ ব্যক্তি করোনা বাহক হয়ে ভাইরাস বয়ে আনে নিজের নিজের দেশে। সেখান থেকেই সচেতনতার অভাব, সংক্রমণ তথ্যের অভাব, সরকারী উদাসীনতা, পর্যাপ্ত মেডিক্যাল ইকুইপমেন্টের অভাব ইত্যাদির ফলে ধীরে ধীরে সংক্রমণের ঘটনা বাড়তে থাকে এবং দেশগুলি দ্রুত তৃতীয় পর্যায়ে পৌঁছাতে থাকে। অর্থাৎ সচেতন বা অবচেতন ভাবেই মানুষ জড়িয়ে পড়তে থাকে করোনার ফাঁদে। মানুষ থেকে অন্য মানুষ, মানুষ থেকে সমাজ এবং সমাজ থেকে সম্পূর্ণ সভ্যতা এই মারণ ফাঁদে আবদ্ধ হয়ে পড়ে। এই মহামারীর থেকে রক্ষা পাওয়ার জন্য মূলত বলা যায়, তৃতীয় পর্যায় রোধের জন্য বিশ্বের তাবড় তাবড় দেশ তাদের অর্থনীতি ধ্বংস হবে জেনেও মানুষের জীবন বাঁচাতে সমগ্র দেশে দীর্ঘ লকডাউনের ডাক দিয়েছে। তৃতীয় পর্যায় থেকে বাঁচতে ভারতের বর্তমান প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী ২৪ শে মার্চ জাতির উদ্দেশ্যে ভাষণে ওই দিন মধ্যরাত্রি থেকে ২১ দিনের লকডাউনের কথা ঘোষণা করেন।

জানুয়ারি ২০২০ অনুযায়ী ভারতের সম্ভাব্য জনসংখ্যা ১৩৮,৭২,৯৭,০০০। এ হিসেবে দেশের জনঘনত্ব প্রতি বর্গ কিমিতে ৪৬৪ জন। ভারতে এই মারণ ফাঁদ কতটা বিধ্বংসী, কতটা নিদারুণ হয়ে উঠতে পারে তা চিন্তাতীত। নভেম্বর ২০১৯-এ PTI প্রদত্ত তথ্য অনুযায়ী ভারতে ডাক্তার – জনসংখ্যা অনুপাত ১:১৪৪৫ অর্থাৎ ১৪৪৫ জন ভারতীয়র জন্য মাত্র ১ জন ডাক্তার রয়েছেন। বর্তমান পরিস্থিতিতে ভারতে যদি ১০% মানুষ এই মারণ ফাঁদে আটকে পড়ে তাহলে সংখ্যার হিসাবে তা হবে প্রায় ১৪ লক্ষ। এত সংখ্যক মানুষের চিকিৎসা পরিকাঠামো এই মুহূর্তে ভারতের নেই। অর্থাৎ দ্বিতীয় পর্যায়ে এই মারণ ফাঁদ ছিঁড়ে না বেরিয়ে আসতে পারলে সমূহ মৃত্যু রোধ করা সম্ভব নয়। ধীরেধীরে ভেঙে পড়বে স্বাস্থ্য ব্যবস্থা, ভেঙে পড়বে অর্থনৈতিক ব্যবস্থা, প্রশাসনিক ব্যবস্থা। গতকাল ২৯/০৩/২০২০ এর তথ্য অনুযায়ী ভারতে সংক্রমণের সংখ্যা ১০০০ ছাড়িয়ে গেছে। এর মধ্যে কেরল, মহারাষ্ট্র অগ্রগামী। এই প্রবণতা বজায় থাকলে ম্যালথাসের জ্যামিতিক তত্ত্ব অনুসারে সংক্রমণ কতটা ছাড়িয়ে যেতে পারে তা বলা মুশকিল। সংক্রমণ যতো বাড়বে পরিস্থিতি ততো সঙ্গিন হতে থাকবে। বিশ্বের প্রথম সারির রাষ্ট্রনেতার চোখের জলেই তার প্রমাণ হয়ে গেছে।

তাহলে কি মারণ ফাঁদ থেকে বেরোনোর কোন উপায় নেই? রয়েছে তো, করোনা সংক্রমণ থেকে মুক্তির উপায় সচেতনতাভাবে সামাজিক দূরত্ব বজায় রেখে নিজেকে ও নিজের পরিবারকে নিজ গৃহে গৃহবন্দী করে রাখা তথা লকডাউন সম্পূর্ণরুপে সফল করা। যদিও তা সহজ নয় এবং মানসিক, জৈবিক ও অর্থনৈতিক চাপে মানুষ জর্জরিত হয়ে পড়বে তবুও এই মুহূর্তে জীবন-পরিবার বাঁচাতে সরকারী সমস্ত নির্দেশ জীবনের মূল মন্ত্র করে অক্ষরে অক্ষরে পালন করতে হবে। জান হ্যায় তো জাঁহান হ্যায়। পরিস্থিতি যতই কঠিন হোক না কেন তার কাছে মাথা নোয়ানো যাবে না, তাকে জয় করে মাথা তুলে ঘুরে দাঁড়াতে হবে। আগামী অদূর ভবিষৎ আমাদের কাছে কি বয়ে আনছে তা দেখার জন্য অপেক্ষা ছাড়া আর উপায় নেই। অন্তিম পর্যায়ে সমস্ত পাঠককুলের কাছে এই অধমের করজোড়ে নিবেদন বাড়ির মধ্যে থাকুন — সুস্থ থাকুন, সামাজিক দূরত্ব বজায় রাখুন। কোন অবস্থাতেই নিজেকে ও নিজের পরিবারকে মারণ ফাঁদে জড়াতে দেবেন না।

লেখকঃ- গোপাল মণ্ডল (চৌবাটা, বাঁকুড়া)
[লেখক মিশন জিওগ্রাফি ইন্ডিয়ার সহকারী সম্পাদক]
তথ্যসূত্রঃ- CIA – The World Fact-book ২০১৬ ; United Nations World Population Prospects ২০১৫ ; WHO ; WORLDOMETER ; PTI

প্রথম প্রকাশঃ ভূগোলিকা ফেসবুক পেজ, তৃতীয় বর্ষপূর্তি-৩০/০৩/২০২০

©ভূগোলিকা-Bhugolika
©মিশন জিওগ্রাফি ইন্ডিয়া

Content Protection by DMCA.com
এখান থেকে শেয়ার করুন
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  

গোপাল মণ্ডল

সহকারী সম্পাদক, মিশন জিওগ্রাফি ইন্ডিয়া (চৌবাট্টা, বাঁকুড়া)

মন্তব্য করুন

error: মিশন জিওগ্রাফি ইন্ডিয়া কর্তৃক সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত