প্রবালপ্রাচীর – সমুদ্রের বৃষ্টিঅরণ্য

সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে প্রায় ২০০ মিটার (৬০০ ফুট) নিচে এক আশ্চর্য সামুদ্রিক পরিবেশে বিরাজ করে কিছু অমেরুদণ্ডী প্রাণী, তারা প্রবাল (Coral) নামে পরিচিত। প্রবাল হল অ্যান্থোজোয়া (Anthozoa) শ্রেনীর সামুদ্রিক প্রাণী। প্রবাল মূলত দুই ধরনের হয় — (১) পরিষ্কার, উষ্ণ গ্রীষ্মমন্ডলীয় অগভীর জলের (২) গভীর শীতল জলের এবং এগুলি হ’ল তরঙ্গ প্রতিরোধী শিলা কাঠামো, যা ক্যালসিয়াম কার্বনেট-সৃষ্টিকারী প্রাণী এবং গাছপালা দ্বারা তৈরি।

প্রবাল প্রাচীরগুলি বিশ্বের অন্যতম বৈচিত্র্যময় বাস্তুতন্ত্র। এই জীবগুলি নিডারিয়া (Cnidaria) পর্বের অন্তর্ভুক্ত৷ প্রবাল তার নিকটাত্মীয় সাগর কুসুম (Sea Anemone) -এর মতই পলিপ তৈরি করে কলোনি তৈরি করে৷ কলোনির সমস্ত পলিপ জিনগত অভিন্ন। ক্রমবর্ধিষ্ণু প্রবাল কলোনিগুলিকে প্রবাল মস্তক বলা হয়। মস্তকটি আসলে বহু প্রবাল পলিপ নিয়ে গঠিত৷ এদের ব্যাস কয়েক মিলিমিটার হয়। প্রবাল মস্তকগুলো বেড়ে ওঠে পলিপগুলোর অযৌন ও যৌন প্রজননের মাধ্যমে৷ প্রজনন ঋতুতে পূর্ণিমার রাতে বা তার কাছাকাছি সময়ে কয়েক রাত ধরে সাগরে শুক্রানু এবং ডিম্বানু ছেড়ে মিলিত হয়। এরা প্রাণী হলেও, পূর্ণবয়ষ্ককালে সাগরতলে কোন দৃঢ়তলের উপর জীবনপার করে দেয় নিশ্চল হয়ে। প্রতিটি প্রবাল পলিপ যেখানে গেড়ে বসে সেখানে নিজের দেহের চারপাশে ক্যালসিয়াম কার্বনেট নিঃসরণের মাধ্যমে শক্ত পাথুরে বহিঃকঙ্কাল তৈরি করে। একটা প্রবাল পলিপের মৃত্যুর পরেও খোলসটি থাকে এবং তা অস্মীভূত হয়৷ পরে অস্মীভূত প্রবালের দেহাবশেষের উপর নতুন করে আবার প্রবাল বসে। এভাবে বহু প্রজন্মের সাহায্যে বড় পাথুরে আকৃতি তৈরী করে৷ তবে এখানেই শেষ নয়, মৃত প্রবালের দেহ স্তূপাকারে জমা হয়ে নানা আকৃতির কাঠামো তৈরি করে, যা প্রবাল প্রাচীর (Coral Reef) নামে পরিচিত। প্রবাল প্রাচীরগুলি সমুদ্রের প্রাচীনতম বাসস্থানগুলির মধ্যে একটি। ধীরে ধীরে এদের বৃদ্ধি ঘটে এবং প্রবাল প্রাচীরের প্রথম কলোনির লার্ভা থেকে সম্পূর্ণরূপে বিকাশ হতে ১০ হাজার বছর পর্যন্ত সময় লাগতে পারে৷

প্রবাল প্রাচীরের আকার, গঠন অনেকটাই নির্ভর করে সমুদ্র তলদেশের পরিবেশের উপর। সাধারণত বিভিন্ন চুন জাতীয় দেহাবশেষ সঙ্ঘবদ্ধ হয় এবং প্রবাল দ্বীপগুলি একসঙ্গে যুক্ত হয়ে বিভিন্ন আকারের প্রাচীর তৈরি করে। পরিবেশবিদরা প্রবাল প্রাচীর গুলিকে ‘সমুদ্রের বৃষ্টিঅরণ্য’ (Rain Forest of the Sea) বলে অভিহিত করেন। উষ্ণমণ্ডলীয়/ক্রান্তীয় প্রবাল প্রাচীরগুলির সৌন্দর্যের প্রতি আকৃষ্ট হয়ে চার্লস ডারউইন উল্লেখ করেছিলেন — “ক্রান্তীয় অঞ্চলের প্রবাল প্রাচীর গুলি অনেকটা মরুভূমির মরূদ্যানের ন্যায়”। ১৮৪২ সালে তিনি তাহিতি দ্বীপ অতিক্রম করার সময় একটি বিশেষ তথ্য উল্লেখ করে লিখেছিলেন — “প্রবাল প্রচুর সংখ্যায় স্বীয় বংশবৃদ্ধি করে তখনই, যখন সমুদ্রের জল স্বচ্ছ, স্থির ও উষ্ণ অবস্থায় থাকে”। তিনি আরও আলোকপাত করেন যে ক্রান্তীয় প্রবাল প্রাচীরগুলি, যা পৃথিবীর সবচেয়ে বৈচিত্র্যময় বাস্তুসংস্থানগুলির মধ্যে অন্যতম, পৃথিবীর সমুদ্র অঞ্চলের মাত্র ০.১% জুড়ে আছে।

সাধারণত ২২ থেকে ২৮ ডিগ্রি তাপমাত্রা প্রবাল প্রাচীর গঠনে সবচেয়ে সহায়ক, কারন এই তাপমাত্রায় ফাইটোপ্ল্যাঙ্কটন জন্মায়৷ ফাইটোপ্ল্যাঙ্কটন এক ধরনের অতিক্ষুদ্র উদ্ভিদ যা জুপ্ল্যাঙ্কটন নামের এক সূক্ষ্ম প্রাণীর প্রধান খাদ্য। আর প্রবালের প্রধান খাদ্যই হচ্ছে এই জুপ্ল্যাঙ্কটন৷ সমুদ্র তলদেশের এই আশ্চর্যপূর্ণ খাদ্যচক্র তৈরি করে এক বৈচিত্র্যময় বাস্তুতন্ত্র৷ পৃথিবীর কিছু কিছু প্রবাল প্রাচীর আজ থেকে প্রায় ৫০ মিলিয়ন বছর আগে বেড়ে উঠেছে যা এখনও ক্রমবর্ধমান। অধ্যাপক এ. জি. মেয়ার (A.G Mayer)-এর মতে, প্রশান্ত মহাসাগরে বিগত ৩০ হাজার বছর ধরে প্রবাল প্রাচীর গঠিত হয়ে চলছে। প্রশান্ত মহাসাগরের ওয়েক (Wake) দ্বীপ একটি উল্লেখযোগ্য প্রবাল প্রাচীর। প্রবাল প্রাচীর সাধারণত সমুদ্রপৃষ্ঠের কাছাকাছি নিজেদের কলোনি গড়ে তোলে কারন সূর্যের আলো প্রবালের জীবন চক্রের প্রধান উপাদান। তাপমাত্রা ১৮ ডিগ্রির নিচে নেমে গেলে সেখানে প্রবাল বাঁচতে পারে না। এই কারনেই অধিকাংশ প্রবাল প্রাচীর মোটামুটি ভাবে ৩০ ডিগ্রি উত্তর অক্ষাংশ থেকে ৩০ ডিগ্রি দক্ষিণ অক্ষাংশের মধ্যে লক্ষ্য করা যায়। তবে আন্টার্কটিকা, অস্ট্রেলিয়া, কানাডা, জাপান, নিউজিল্যান্ড, ইউরোপ এবং মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে শীতল জলের প্রবালগুলি পাওয়া যায়৷ শীতল জলের প্রবালগুলি কাজ করার জন্য আলোর প্রয়োজন হয় না। তারা তাদের প্রাপ্ত পুষ্টি লাভ করে প্ল্যাঙ্কটন এবং জৈব কণা স্রোত থেকে। যার মধ্যে রয়েছে প্রস্তর প্রবাল, নরম প্রবাল, কালো প্রবাল এবং জরি প্রবাল। তাদের বেশিরভাগই প্রাচীর তৈরি করে না, তবে ঘন কলোনিতে বৃদ্ধি পায়। সমস্ত শীতল জলের প্রবালগুলি অত্যন্ত ভঙ্গুর হয়৷

প্রবাল প্রাচীর প্রধানত ৩ প্রকার — (১) প্রান্তদেশীয় প্রবাল প্রাচীর (Fringing Reefs) :- মহাদেশ ও দ্বীপগুলির উপকূল রেখার নিকটবর্তী অঞ্চলে গড়ে ওঠে। এগুলি খুব একটা সুবিন্যস্ত এবং সুগঠিত হয়না। যেমন— কেনিয়ার মালিন্দি উপকূলে প্রান্তদেশীয় প্রবাল প্রাচীর দেখা যায়। (২) পুরোদেশীয় প্রবাল প্রাচীর (Barrier Reef) :- যখন প্রবাল প্রাচীর উপকূল থেকে কিছুটা দূরে গড়ে ওঠে এবং প্রাচীর ও উপকূলের মধ্যে একটা অগভীর ও অ-প্রশস্ত উপহ্রদ/লেগুন থাকে। একে প্রতিবন্ধক প্রবাল প্রাচীরও বলে। যেমন— পৃথিবীর বৃহত্তম প্রবাল প্রাচীর, অস্ট্রেলিয়ার গ্রেট বেরিয়ার রিফ, যা দৈর্ঘ্যে প্রায় ২৩০০ কিমি বিস্তৃত এবং ২,৯০০+ একক প্রবাল প্রাচীর এবং ৯০০+ দ্বীপের সমন্বয়ে গঠিত৷ (৩) বলয়াকৃতি প্রবাল প্রাচীর/অ্যাটল (Atolls) :- সাধারণত সমুদ্রের মাঝখানে গড়ে ওঠে। অনেকসময় সমুদ্রে নিমজ্জিত মৃত আগ্নেয়গিরির জ্বালামুখের উঁচু প্রান্তদেশে গড়ে ওঠে এবং জ্বালামুখটি উপহ্রদ/লেগুন হিসেবে অবস্থান করে। যেমন— ভারত মহাসাগরে মালদ্বীপে অনেক অ্যাটল দেখা যায়। পৃথিবীর কয়েকটি বিখ্যাত অ্যাটল হল — বিকিনি অ্যাটল, রা অ্যাটল, কুরে অ্যাটল, ফুনাফাটি অ্যাটল প্রভৃতি।

প্রবাল প্রাচীর এই গ্রহের সবচেয়ে বৈচিত্র্যময় বাস্তুতন্ত্র৷ প্রবাল প্রাচীররা সমুদ্র তরঙ্গ এবং ক্রান্তীয় ঝড়ের ক্ষতিকারক প্রভাবগুলি থেকে উপকূলরেখাকে রক্ষা করে। এছাড়া অনেক সামুদ্রিক জীবের জন্য বাসস্থান এবং আশ্রয় সরবরাহ করে। সমুদ্রবিজ্ঞানীদের ধারণা, প্রবাল প্রাচীর অন্য কোনো সামুদ্রিক পরিবেশের তুলনায় প্রতি একক এলাকায় অধিক প্রজাতি বাসস্থান সুনিশ্চিত করে যার মধ্যে ৪০০০ প্রজাতির মাছ, ৮০০ প্রজাতির জেলিফিশ এবং শতাধিক অন্য প্রজাতি রয়েছে। বিজ্ঞানীরা আরও ধারণা করেন যে প্রায় ১ কোটিরও বেশি অজ্ঞাত জীব প্রজাতির বাস এইসব প্রবাল প্রাচীরে। এই সব প্রবাল প্রাচীরের জীব বৈচিত্র্য ২১ শতকের জন্য নতুন ওষুধ খোঁজার প্রধান বিবেচিত স্থান হিসেবে গণ্য করা হচ্ছে। ক্যান্সার, বাত, ব্যাকটেরিয়াল সংক্রমণ, ভাইরাস এবং অন্যান্য রোগের সম্ভাব্য প্রতিকারের ওষুধের উপাদান এবং অনেক মাদকদ্রব্য বর্তমানে প্রবাল-প্রাচীর বা রিফে বসবাসকারী প্রাণী ও উদ্ভিদের থেকে নেওয়া হচ্ছে। অপরিমিত জৈবিক সম্পদের সংরক্ষণাগার এই প্রবালপ্রাচীর গুলি লক্ষ লক্ষ লোককে অর্থনৈতিক ও পরিবেশগত সেবা প্রদান করে। প্রবাল প্রাচীরগুলির বৈশ্বিক আর্থিক মূল্য ৩৭৫ বিলিয়ন ডলার/বছর (The value of the world’s ecosystem services and natural capital – Nature – মে, ১৯৯৭), যা পৃথিবীর পৃষ্ঠতলের ১% এর কম জায়গা জুড়ে অবস্থিত। সাম্প্রতিক গবেষণায় দেখানো হয় যে লক্ষ লক্ষ লোক ফ্লোরিডা উপকূলে প্রতি বছর প্রবালপ্রাচীর পরিদর্শন করেন। এই প্রাচীরগুলিতে শুধুমাত্র ৭.৫ বিলিয়ন ডলার এর সম্পদ মূল্য আছে বলে ধরা হয় (জনস্, ২০০১)।
জলবায়ু পরিবর্তন, উষ্ণায়ন, সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধি এবং সামুদ্রিক জলে রাসায়নিক যৌগ মিশে যাওয়ার ফলে প্রবাল প্রাচীর আজ ধ্বংসের দোরগোড়ায়। প্রবাল ‘পলিপ’ গুলি খুব সংবেদনশীল হওয়ায়, জলের একটু তাপমাত্রা পরিবর্তনের ফলেই মরে যায়। বায়ুমণ্ডলে উপস্থিত বেশিরভাগ কার্বন ডাই অক্সাইড যা কিনা মানুষের কর্মকাণ্ডের ফলে তৈরি, তার ১/৩ শতাংশ সমুদ্রে দ্রবীভূত হয়। এরফলে সমুদ্রের কার্বন ডাই অক্সাইড বৃদ্ধি পায় এবং সাগরের জল অম্লীয় হয়ে ওঠে, একে মহাসাগরীয় অম্লকরণ বলা হয়। এই অম্লকরণের ফলে প্রবাল ‘পলিপ’ গুলি ক্যালসিয়াম কার্বোনেটকে শোষণ করতে পারে না, যা তাদের গঠনকে বজায় রাখে এবং প্রবাল প্রাচীর তৈরি করতে সাহায্য করে। পরিবেশবিদরা মনে করেন বিগত এক দশকে বিশ্ব-উষ্ণায়ন ফলে পৃথিবীর ১৫-২০% প্রবাল প্রাচীর ধ্বংস হয়ে গেছে, যা কোনভাবেই ফিরিয়ে আনা সম্ভব নয়। আমদের দৈনন্দিন কর্মকাণ্ড শুধু পৃথিবীর উপরিভাগের পরিবেশকে ধ্বংস করছে না, সমান ক্ষতি করছে মহাসাগরের তলদেশকেও যার মূল্য দিতে হচ্ছে হাজার হাজার প্রজাতির প্রাণীকে, মানুষও তার ব্যতিক্রম নয়। মানবজাতির অনিয়ন্ত্রিত কর্মকাণ্ডের ফলে বিলুপ্তির পথে ধাবমান। এছাড়াও প্রাকৃতিক কারণগুলি — ঝড় ও জলোচ্ছ্বাস ; এল নিনো: পরিবর্তিত বৃষ্টিপাত থেকে সমুদ্র পৃষ্ঠের তাপমাত্রা বৃদ্ধি, সমুদ্রের স্তর হ্রাস এবং লবণাক্ততা বৃদ্ধি ; মাছ, সামুদ্রিক কীট, কাঁকড়া, শামুক ইত্যাদির সংখ্যা হ্রাস ; ধূলোবালির প্রকোপ বৃদ্ধি প্রভৃতি। বিজ্ঞানীদের আশঙ্কা যে, যেভাবে পৃথিবীর পরিবেশ প্রবালপ্রাচীরের জন্য ক্রমশ প্রতিকূল হয়ে উঠছে, তার ফলে আগামী কয়েক দশক পর পৃথিবীর অধিকাংশ প্রবালপ্রাচীরই ধ্বংসের মুখে দাঁড়িয়ে রয়েছে।

লেখকঃ- সুজয় কুমার দোলই (খড়্গপুর, পশ্চিম মেদিনীপুর)
[লেখক চন্দনসরিষা প্রাথমিক বিদ্যালয় (বেলদা) -এর সহশিক্ষক]
তথ্যসূত্রঃ- Wikipedia ; আধুনিক ভূ- জলবিদ্যা ও সমুদ্রবিদ্যা — দ্যুতিমান ভট্টাচার্য, মৈত্রেয়ী চক্রবর্তী (নবোদয় পাবলিকেশন) ; Oceanography – D S Lal
বিশেষ কৃতজ্ঞতাঃ- সৌরভ ঘোষাল (প্রবাল কথা – অবসর ওয়েবসাইট)

প্রথম প্রকাশঃ ভূগোলিকা ফেসবুক পেজ, তৃতীয় বর্ষপূর্তি-৩০/০৩/২০২০

©ভূগোলিকা_Bhugolika
©মিশন জিওগ্রাফি ইন্ডিয়া

Content Protection by DMCA.com
এখান থেকে শেয়ার করুন
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  

সুজয় কুমার দোলই

সহশিক্ষক, চন্দনসরিষা প্রাথমিক বিদ্যালয় (বেলদা)। ঠিকানা: খড়্গপুর, পশ্চিম মেদিনীপুর।

One thought on “প্রবালপ্রাচীর – সমুদ্রের বৃষ্টিঅরণ্য

  • September 8, 2020 at 11:21 am
    Permalink

    অসাধারণ

    Reply

মন্তব্য করুন

error: মিশন জিওগ্রাফি ইন্ডিয়া কর্তৃক সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত