ফারাক্কা বাঁধের ইতিকথা

ভারতের বহুলচর্চিত নদীবাঁধগুলির মধ্যে একটি হল — ‘ফারাক্কা বাঁধ’। পুণ্যতোয়া গঙ্গা পশ্চিমবঙ্গের মুর্শিদাবাদ জেলায় দ্বি-বিভক্ত হওয়ার পূর্বে ফারাক্কাতে ১৯৭০-এর দশকে এই বাঁধটি নির্মিত হয়। বাংলাদেশ সীমান্ত থেকে মাত্র ১৮ কিমি দূরে অবস্থিত ফারাক্কা বাঁধ পরিবেশগত ও কূটনৈতিক দৃষ্টিকোণে একটি গুরুত্বপূর্ণ ও বিতর্কিত বিষয়।

ফারাক্কা বাঁধ নির্মাণের প্রেক্ষাপট অনেক পুরানো। কলকাতা বন্দরসহ ভাগীরথী-হুগলি নদীর নাব্যতা বজায় রাখার উপায় খুঁজতে ব্রিটিশ আমলে ১৮৫১-১৯৪৬ সময়কালে কমপক্ষে ৫ টি সমীক্ষা করা হয়েছিল। ১৯৫০ ও ১৯৬০-এর দশকে কলকাতা বন্দর অঞ্চলে ভাগীরথী-হুগলি নদীতে নাব্যতা বজায় রাখতে ফারাক্কা বাঁধ নির্মাণের পরিকল্পনা শুরু হয়। ফারাক্কা বাঁধ নির্মাণের মুখ্য উদ্দেশ্য ছিল মূল গঙ্গা নদী থেকে ১৮০০ ঘনমিটার/সেকেন্ড জল ভাগীরথী-হুগলি শাখাতে সরবরাহের মাধ্যমে ভাগীরথী-হুগলি নদীকে পুনরুজ্জীবিত করে কলকাতা বন্দরকে পলিমুক্ত করে নাব্যতা বজায় রাখা।

১৯৬১ সালে হিন্দুস্তান কনস্ট্রাকশন কোম্পানি ফারাক্কা বাঁধ নির্মাণের কাজ শুরু করে এবং ১৯৭০ সালে নির্মাণ কাজ সম্পূর্ণ হয়। ১৯৭৫ সালে এই বাঁধটি চালু হয়। ফারাক্কা বাঁধটির দৈর্ঘ্য ২৩০৪ মিটার এবং বাঁধটিতে ১০৯ টি গেট রয়েছে। ফারাক্কা বাঁধ থেকে ভাগীরথী-হুগলি নদী পর্যন্ত ৪২ কিমি দীর্ঘ ফিডার ক্যানালও রয়েছে। এই বাঁধ নির্মাণে ব্যয় হয় ১৫৬.২৫ কোটি টাকা। ফারাক্কা বাঁধ শুধুমাত্র একটি নদীবাঁধ, একই সাথে সড়ক ও রেল যোগাযোগের সেতু হিসাবেও এটি ব্যবহৃত হয়।

ফারাক্কা বাঁধ নির্মাণের পর স্বাধীন বাংলাদেশ রাষ্ট্রের সঙ্গে দীর্ঘকাল আলাপ-আলোচনা এবং স্বল্পমেয়াদী কিছু চুক্তির পর, ১৯৯৬ সালে ভারত ও বাংলাদেশের মধ্যে ফারাক্কায় জলবন্টন নিয়ে ৩০ বছর মেয়াদী ‘গঙ্গা চুক্তি’ স্বাক্ষরিত হয়। এই চুক্তি অনুযায়ী, শুষ্ক মরসুমে অর্থাৎ ১লা জানুয়ারি থেকে ৩১শে মে পর্যন্ত দুই দেশ চুক্তিতে উল্লেখিত ফর্মুলা অনুযায়ী জল ভাগাভাগি করে নেয়। ভারত ও বাংলাদেশ — যার যার ন্যায্য ভাগ পেল কিনা সেটা জানুয়ারি থেকে মে মাস পর্যন্ত পর্যবেক্ষণ করে দুই দেশের নদী কমিশনের পর্যবেক্ষণ দল। ভারতের অংশে দৈনিক জলের প্রবাহ পর্যবেক্ষণ ও রেকর্ড করা হয় ফারাক্কা বাঁধের নীচে, ফিডার ক্যানেলে এবং নেভিগেশন লকে। বাংলাদেশে কী পরিমাণ জল প্রবেশ করছে, তা পরিমাপ করা হয় হার্ডিঞ্জ ব্রিজ পয়েন্টে। জুন থেকে অক্টোবর মাস পর্যন্ত অর্থাৎ বর্ষা মরসুম জুড়ে জল কী পরিমাণ আটকে রাখা হবে বা ছাড়া হবে সেটা নির্ভর করে ভারতের অংশে গড় বৃষ্টিপাত ও নদীর জলপ্রবাহের ওপর। আর, নভেম্বর ও ডিসেম্বর মাসে ফারাক্কা বাঁধের সামনে যে পুকুর (রেকর্ডিং লেভেল পন্ড) রয়েছে, তার জলের স্তর অনুযায়ী জলের প্রবাহ নিয়ন্ত্রণ করা হয়। বাংলাদেশের বিভিন্ন মহল থেকে ভারতের বিরুদ্ধে অভিযোগ তোলা হয় যে, ভারত ইচ্ছেমতো অনিয়ন্ত্রিতভাবে জল অপসারণ করছে বা জল আটকে দিচ্ছে। যদিও তা সত্য নয়। এবিষয়ে বিবিসি নিউজ বাংলার অক্টোবর, ২০১৯ এর এক প্রতিবেদনে বাংলাদেশের জলসম্পদ মন্ত্রণালয়ের সচিব বলেন, “…এখানে বাংলাদেশ কখনোই তার ন্যায্য হিস্যা পায়নি- এমন নজির নেই।”

গত চার দশকেরও বেশি সময়ে ফারাক্কা বাঁধ গঙ্গা অববাহিকায় ব্যাপক পরিবর্তন আনে যার কারণে ক্ষতির মুখে পড়েছে ভারত ও বাংলাদেশ — দুই দেশই। ভারতের ক্ষেত্রে সমস্যাগুলি হল — ভাগীরথী-হুগলি নদীকে পুনরুজ্জীবিত করা গেলেও কলকাতা বন্দরকে পুরোপুরি পলিমুক্ত করা যায়নি ; পশ্চিমবঙ্গের মালদা ও মুর্শিদাবাদ জেলাতে নদীভাঙন ; বিহার ও উত্তরপ্রদেশের একাংশে জলাবদ্ধতা। অন্যদিকে, বাংলাদেশে পদ্মা নদীতে শুষ্ক ঋতুতে জলাভাব, চর সৃষ্টি এবং বর্ষা ঋতুতে নদীভাঙন দেখা যায়। পরিশেষে একথা বলা যায়, পরিবেশগত সমস্যা ও কূটনৈতিক জটিলতা থাকলেও তৎকালীন সময়ের প্রেক্ষাপটে ভাগীরথী-হুগলি নদীর পুনরুজ্জীবনের জন্য হয়তো ফারাক্কা বাঁধের বিকল্প ছিল না।

লেখিকাঃ- দেবিকা হালদার (জলঙ্গি, মুর্শিদাবাদ)
[লেখিকা কল্যাণী বিশ্ববিদ্যালয়ের ভূগোল স্নাতকোত্তর বিভাগের ছাত্রী]
তথ্যসূত্রঃ- Wikipedia ; আনন্দবাজার পত্রিকা ; বিবিসি নিউজ বাংলা ; বাংলাপিডিয়া ; প্রথম আলো

©ভূগোলিকা-Bhugolika
©Mission Geography India

Content Protection by DMCA.com
এখান থেকে শেয়ার করুন
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  

মন্তব্য করুন

error: মিশন জিওগ্রাফি ইন্ডিয়া কর্তৃক সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত