যদি মানব সভ্যতা ধ্বংস হয়, তবে মানবহীন পৃথিবীর অবস্থা কেমন হবে?

পৃথিবীতে যদি নোবেল করোনার চেয়ে শক্তিশালী ঘাতক ভাইরাস বা ব্যাকটেরিয়ার সংক্রমণজনিত মহামারী বা জৈব-যুদ্ধের (Bio-War) কারণে কেবলমাত্র মানব সভ্যতা ধ্বংস হয়ে যায়, তাহলে সেই পরিস্থিতিতে মানবহীন পৃথিবীর অবস্থা কেমন হবে?

মানবসভ্যতা ধ্বংস
ঘাতক ভাইরাস সংক্রমণ

আমাদের বিশেষজ্ঞদের মনেও এই প্রশ্ন অনেকবার উঠেছে, আর সাধারণ মানুষ এর জবাব জানার জন্য খুব উৎসুক। এই প্রশ্ন বলতে ও শুনতে বড়ো অদ্ভূত মনে হয় কেননা এই সময় পৃথিবীতে প্রায় ৭৫০ কোটি+ মানুষ বসবাস করছে ; আর একসাথে এতো মানুষের মারা যাওয়ার ব্যাপারটা বড়ো অদ্ভূত। কিন্তু আমরা যদি ধরেই নিই যে, যদি পৃথিবী থেকে সমস্ত মানুষ ঘাতক ভাইরাস জনিত মহামারীর কারণে মারা যায় তাহলে মানবহীন পৃথিবী কেমন হবে? চলুন তা আমরা বৈজ্ঞানিক দৃষ্টিকোন থেকে জানার চেষ্টা করি। মনে রাখবেন, এক্ষেত্রে কেবলমাত্র পৃথিবী থেকে মানব প্রজাতিই মারা যাবে আর অন্য প্রজাতি যেমন রয়েছে তেমনই থাকবে।

পৃথিবী থেকে মানব সভ্যতা ধ্বংসের ২৪ ঘন্টা বা ৪৮ ঘন্টার মধ্যে এর খবর পৃথিবীর চারিদিকে আবর্তনকারী স্যাটেলাইটে ধরা পড়বে। সাধারণ সময়েও রাতে আমেরিকার ৬২% আকাশ আলোকিত হয়ে থাকে, ইউরোপে ৮৫% আকাশ আলোকিত থাকে ও জাপানের আকাশ ৫৮% আলোকিত থাকে। মানব প্রজাতি ধ্বংস হওয়ার ২৪ ঘন্টা পর পুরো পৃথিবীতে রাতে অন্ধকার নেমে আসবে, যা ধরা পড়বে কৃত্রিম স্যাটেলাইটে। এই সময় সমস্ত পাওয়ার স্টেশন বন্ধ হয়ে যাবে। পৃথিবীতে বর্তমানে মোট ৪৫০টি Nuclear Power Plant রয়েছে। এই নিউক্লিয়ার স্টেশনের রিঅ্যাক্টরকে শীতল রাখার জন্য কুলিং টাওয়ারে প্রচুর জলের প্রয়োজন হয় আর প্যাম্প চালানোর জন্য বিদ্যুতের প্রয়োজন হয়। তাই বিনা বিদ্যুতে নিউক্লিয়ার স্টেশনের উষ্ণতা চরম সীমায় পৌঁছে যায় এবং ইউরেনিয়াম গলে গিয়ে আগুন জ্বালিয়ে নিউক্লিয়ার স্টেশনের ছাদ ফেটে তা বাইরে বেরিয়ে আসবে। আর এই ক্ষতিকর রাসায়নিক মেঘ সৃষ্টি হয়ে চারিদিকে ছড়িয়ে পড়বে। সেই সঙ্গে আমাদের গৃহপালিত পশু সবার আগে না খেতে পেয়ে মারা যাবে। কেননা আমরা ছাড়া এদের খেতে দেওয়ার কেউ নেই।

মানবহীন পৃথিবী

মানব সভ্যতা ধ্বংসের ৭ দিন পর, পৃথিবীর ছোটো-বড়ো শহরে প্রতিদিন লক্ষ লক্ষ টন ভৌমজল তোলা মানব জাতি আর থাকবে না। ফলস্বরূপ পৃথিবীর Ground Water Level আস্তে আস্তে উপরে উঠে আসবে। আর এই ভৌমজল উপরে চলে আসার জন্য গর্তের মধ্যে থাকা ইঁদুর বাইরে বেরিয়ে আসবে। এই ইঁদুরের দল শহরের শপিং মল ও দোকানের খাদ্য সামগ্রী ধীরে ধীরে খেয়ে শেষ করে দিবে। আর খাদ্য বেশি পরিমাণে পাওয়ায় এদের প্রজনন ক্ষমতা আরও বেড়ে যাবে। যার ফলে পৃথিবীতে ইঁদুরের সংখ্যা লক্ষাধিক হারে বাড়তে থাকবে এবং মানবহীন শহরে ইঁদুরের রাজত্ব চলবে।

মানব সভ্যতা ধ্বংসের ১ মাস পর, যানবাহন ও কলকারখানা থেকে বিষাক্ত ধোঁয়া নির্গত না হওয়ায় বায়ুমণ্ডল ধীরে ধীরে শুদ্ধ হতে থাকবে এবং সেই সঙ্গে বায়ুমণ্ডল থেকে কার্বন ডাই অক্সাইড ধীরে ধীরে কমতে থাকবে। এর ফলে পৃথিবীর সমগ্র পরিবেশ পরিষ্কার ও শুদ্ধ হয়ে উঠবে। আর ৩-৪ মাস পর আকাশ এতটাই শুদ্ধ হয়ে যাবে যে, অনেক তারা, মহাজাগতিক দৃশ্য, এমনকি আমাদের আকাশগঙ্গাকে পরিষ্কার খালি চোখে আবার দেখা যাবে। কিন্তু দুঃখের বিষয় এমন সুন্দর দৃশ্য উপভোগ করার জন্য কোনো মানুষ বেঁচে থাকবে না।

মানব সভ্যতা ধ্বংসের ১ বছর পর, সিমেন্ট ও কংক্রিটের তৈরি সমস্ত বিল্ডিং ঝড়, তুফান, বৃষ্টি ও জঙ্গলের সামনে বেশিদিন টিকতে পারবে না। আধুনিক বিল্ডিংকে পরিচর্যা করার জন্য আর কোনো মানুষ বেঁচে না থাকায় বিভিন্ন গাছ বিল্ডিং -এ গজিয়ে উঠবে এবং আস্তে আস্তে সেই বিল্ডিং ভেঙে দিবে। সমস্ত বিল্ডিং ও ব্রিজ ভেঙে মাটিতে মিশে যেতে থাকবে। আর ধীরে ধীরে এর উপর ঘাস ও গাছপালা জন্মাতে থাকবে। এই রকম অবস্থা সমগ্র পৃথিবীতে সৃষ্টি হবে।

জঙ্গলে ঢেকে গেছে পুরো শহর

মানব সভ্যতা ধ্বংসের প্রায় ১০ বছর পর, সমগ্র পৃথিবীতে জঙ্গলের রাজত্ব চলবে। চারিদিকে গাছপালাতে ভরে যাবে। আগে যেখানে বড়ো বড়ো শপিং মল ও বিল্ডিং ছিলো সেখানে এখন গাছপালায় ঢাকা। শহরের রাস্তায় বন্য পশু, যেমন- বাঘ, সিংহ, হরিণ, ভাল্লুক ঘরে বেড়াতে থাকবে। আর সেই সঙ্গে মানুষ না থাকায় সামুদ্রিক প্রাণীদের প্রজননও বৃদ্ধি পাবে। মানব সভ্যতা ধ্বংসের প্রায় ২৫ বছর পর, ডুবাই এর মতো যে সমস্ত শহর মরুভূমির আশেপাশে অবস্থিত সেই সমস্ত শহর আবার মরুভুমিতে পরিণত হবে। প্রকৃতি আমাদের কাছ থেকে সমস্ত জিনিস কেড়ে নিবে যা অতীতে তার ছিল। আর এখন পৃথিবীতে মানুষ না থাকার জন্য সমস্ত ধরনের জীবজন্তু, মাছ ও সামুদ্রিক প্রাণী নিজের বিকাশ দ্রুত করতে পারবে।

মানব সভ্যতা ধ্বংসের প্রায় ১০০ বছর পর, পৃথিবীকে দেখে কেউ বলতে পারবে না যে এখানে কখনো মানুষ বসবাস করত। কেননা পৃথিবীতে সম্পূর্ণরূপে জঙ্গল ও গাছপালায় ভর্তি হয়ে গেছে। সমস্ত মজবুত বাড়ি-ঘর, লোহার তৈরি সামগ্রী ও মানুষের তৈরি সমস্ত দ্রব্য সামগ্রী জঙ্গলের নীচে ঢেকে গেছে।
মানব সভ্যতা ধ্বংসের প্রায় ৩০০ বছর পর, পৃথিবীতে ধাতুর তৈরি জিনিসও ভেঙে যেতে শুরু করবে। যেমন- আইফেল টাওয়ার ও হাওড়া ব্রিজ সহ সমস্ত লোহার তৈরি পুল মরচে ধরে ভেঙে টুকরো টুকরো হয়ে যাবে।

মানব সভ্যতা ধ্বংসের প্রায় ৫০০ বছর পর, পৃথিবীতে সম্পূর্ণরূপে শহরের অস্তিত্ব শেষ হয়ে যাবে। কিন্তু তবুও পাথরের তৈরি কিছু বস্তু তখনো টিকে থাকবে। যেমন- Statue of Unity, Statue of Liberty, চিনের প্রাচীর ও মিশরের পিরামিড। অপরদিকে মানুষ যে সমস্ত পশুদের গার্হস্থ্যকরণে করে পালন করেছিল, সেই সমস্ত পশু জংলী ও হিংস্র হয়ে উঠবে। সেই সঙ্গে নতুন নতুন প্রজাতির আর্বিভাব ঘটবে।

মানব সভ্যতা ধ্বংসের প্রায় ১০০০ বছর পর, পৃথিবীর বায়ুমণ্ডল থেকে কার্বন ডাই অক্সাইডের অস্তিত্ব পুরোপুরি থাকবে না। কেননা বায়ুমণ্ডলের প্রায় ৯৯% কার্বন ডাই অক্সাইড বৃষ্টির মাধ্যমে নীচে নেমে এসে সমুদ্রে চলে যাবে। আর তখন সমুদ্রের তটে কার্বন খন্ডের বা কেলাসের সৃষ্টি হবে। পৃথিবীর আবহাওয়া খুব পরিস্কার ও স্বচ্ছ হয়ে যাবে। মানব সভ্যতা ধ্বংসের প্রায় ১০ হাজার বছর পর, বায়ুমণ্ডল থেকে কার্বন ডাই অক্সাইড পূর্ণ রূপে শেষ হয়ে যাওয়ার পরে পৃথিবীতে বিশ্ব উষ্ণায়নের আর কোনো সম্ভাবনা থাকবে না। পৃথিবীর গড় তাপমাত্রা ২.৫ ডিগ্রি কমে যাবে এবং হিমযুগের সৃষ্টি হবে। ধীরে ধীরে পৃথিবীর বেশিরভাগ জায়গা বরফের চাদরে ঢেকে যাবে।

মানব সভ্যতা ধ্বংসের প্রায় ৫০ হাজার বছর পর, নিউক্লিয়ার স্টেশনের বর্জ্য পদার্থ যা মানুষ মাটির নীচে চাপা দিয়ে ছিল তার ক্ষতিকারক প্রভাব কমে যাবে। আর পৃথিবী থেকে মানব সভ্যতার সমস্ত চিহ্ন ধ্বংস হয়ে যাবে।

মানব সভ্যতা ধ্বংসের প্রায় ১০ কোটি বছর পর, মানব সভ্যতার স্থান দখল করার জন্য অন্য প্রজাতির প্রাণীদের মধ্যে প্রতিযোগিতা চলতে থাকবে। এর মধ্যে সবথেকে এগিয়ে থাকবে বাঁদর ও শিম্পাঞ্জি। কেননা শিম্পাঞ্জি আর মানুষের জেনেটিক ব্লুপ্রিন্ট প্রায় ৯৮% মিলে যায়। এখন কোটি কোটি বছরের বিকাশে ২% এর ঘাটতি পূরণ করে নিতে পারে এবং মানুষের চেহারা নিতে থাকতে পারে। এই সময় আর আগের মানুষের একটাও কোনো চিহ্ন নেই। পৃথিবীতে কখনো মানব সভ্যতার অস্তিত্ব ছিল তার কোনো চিহ্নই থাকবে না এবং এমনকি চাঁদেও মানুষের সমস্ত চিহ্ন মুছে যাবে। পৃথিবীতে কখনো হাইটেক মানব বাস করত তার অস্তিত্বের মধ্যে Time Capsule বাকি থাকল।

মানব সভ্যতা ধ্বংস
Time Capsule

Time Capsule হল এমন একধরনের কনটেইনার যা ৩ ফুট লম্বা ও ২.৫ ফুট চওড়া, যার মধ্যে বর্তমান ও অতীতে যা যা হয়েছে তা লিখে এবং সেই সম্পর্কিত বস্তু তার মধ্যে রেখে সেটিকে মাটির তলায় চাপা দেওয়া হয়। যাতে ভবিষ্যতে নতুন প্রজন্ম তা দেখে ও অধ্যয়ন করে পৃথিবীর ইতিহাস কেমন ছিল তা জানতে পারে। International Time Capsule Society – এর মতে, সমগ্র পৃথিবীতে প্রায় ১০-১৫ হাজার Time Capsule ভূঅভ্যন্তরে রয়েছে। মিশ্র ধাতুর তৈরি এই Time Capsule -এ মানব জাতির ব্যবহৃত সমস্ত বস্তুর ভান্ডার রয়েছে। আমেরিকা ও ভারতসহ অনেক দেশ নিজেদের ইতিহাস লিখে ও ব্যবহৃত দ্রব্যসামগ্রী Time Capsule -এর মধ্যে রেখে অভ্যন্তরে রেখে দিয়েছে। এই Time Capsule এর তুলনা ডাইনোসরের অবশেষের সাথে করা যেতে পারে। ঊনবিংশ শতাব্দীতে যখন ডাইনোসরের জীবাশ্ম পাওয়া যায় তখন মানব সভ্যতা জানতে পারে পৃথিবীতে সর্বপ্রথম মানুষের নয় ডাইনোসরের বাস ছিল। যে ডাইনোসর ১৬ কোটি বছর ধরে পৃথিবীতে রাজত্ব করেছে। কোটি কোটি বছর পরে শিম্পাঞ্জি মানব রূপে বিবর্তন হওয়ার পর ধীরে ধীরে শিক্ষিত করে Sensing Metal Detector এর সাহায্যে Time Capsule খুঁজে বের করার কতটা সম্ভবনা রয়েছে এই বিষয়ে কিছুই সঠিক ভাবে বলা যাবে না। যদি ওরা Time Capsule পেয়েও যায় তাহলে তার মধ্যে থাকা সমস্ত তথ্য থেকে তারা জানতে পারবে যে, অতীতে ১০ লক্ষ বছর ধরে পৃথিবীতে মানবজাতির রাজত্ব ছিল। কিন্তু দুর্ভাগ্যবশত Time Capsule পাওয়ার সম্ভাবনা 0%। Time Capsule যতই মজবুত হোক না কেন কোটি কোটি বছর পর তা সেই অবস্থায় থাকবে তার কোনো নিশ্চয়তা নেই। যদি আমরা মেনেও নিই যে সেটি ঠিক অবস্থায় রয়েছে তাহলেও নিশ্চয়তা নেই যে, ভবিষ্যতের মানুষ তা খুঁজে পাবে। কেননা পৃথিবীর বিভিন্ন সময়ে বিভিন্ন ভূ-গাঠনিক ঘটনা ঘটে থাকে। যার ফলে Time Capsule স্থান পরিবর্তন করে অন্য জায়গাতেও চলে যেতে পারে।

মানবসভ্যতা ধ্বংস
পৃথিবীতে এলিয়েনের রাজত্ব

কিছু বিশেষজ্ঞদের মতে, মানব সভ্যতা ধ্বংসের পরে পৃথিবীকে অন্য গ্রহের প্রাণী তথা এলিয়েন দখল করে নিবে। আবার অনেক বিশেষজ্ঞদের মতে, মানব সভ্যতা ধ্বংসের কোটি কোটি বছর পরে পৃথিবীতে মানুষের মতো নতুন প্রজাতির আর্বিভাব হতে পারে। আবার পৃথিবী সম্পূর্ণরূপে ধ্বংস হয়ে যেতেও পারে। আপনাদের কি মনে হয়, যদি পৃথিবী থেকে মানব সভ্যতা ধ্বংস হয়ে যায় তাহলে মানবহীন পৃথিবীর অবস্থা কেমন হবে?

লেখকঃ- সৌরভ সরকার (গোদাগাড়ী, মুর্শিদাবাদ)
[লেখক মিশন জিওগ্রাফি ইন্ডিয়ার সম্পাদক]
তথ্যসূত্রঃ- Discovery Science ; History TV18 ; Wikipedia
প্রথম প্রকাশঃ ভূগোলিকা ফেসবুক পেজ, তৃতীয় বর্ষপূর্তি-৩০/০৩/২০২০

©ভূগোলিকা-Bhugolika
©মিশন জিওগ্রাফি ইন্ডিয়া

Content Protection by DMCA.com
এখান থেকে শেয়ার করুন
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  

সৌরভ সরকার

প্রতিষ্ঠাতা ও সম্পাদক, মিশন জিওগ্রাফি ইন্ডিয়া (গোদাগাড়ী, মুর্শিদাবাদ)

One thought on “যদি মানব সভ্যতা ধ্বংস হয়, তবে মানবহীন পৃথিবীর অবস্থা কেমন হবে?

  • April 6, 2020 at 7:12 am
    Permalink

    অনেক নতুন নতুন তথ্য জানতে পারলাম।

    Reply

মন্তব্য করুন

error: মিশন জিওগ্রাফি ইন্ডিয়া কর্তৃক সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত