নীলগ্রহের পরিচয়

নীলগ্রহের পরিচয়

পর্যবেক্ষণযোগ্য মহাবিশ্বের আলোকে পৃথিবীকে দেখলে আমাদের পৃথিবী ভার্গো সুপারক্লাস্টার (Virgo Supercluster) এর অন্তর্গত দ্য লোকাল গ্রুপ (The Local Group) নামক গ্যালাক্সি গুচ্ছের আকাশগঙ্গা বা মিল্কিওয়ে (Milky Way) নামক সর্পিল ছায়াপথের কেন্দ্র থেকে ২৬,০০০ আলোকবর্ষ দূরে অবস্থিত ওরিয়ন বাহু (Orion Arm) -তে সংগঠিত সৌর মণ্ডলের (Solar System) তৃতীয় গ্রহ হিসাবে অবস্থান করছে। সৌর মণ্ডলে গ্রহগুলির গঠন অনুযায়ী পৃথিবী শিলাপ্রধান গ্রহ। আকার অনুযায়ী ইহা পঞ্চম বৃহত্তম গ্রহ এবং সূর্যের সাপেক্ষে অবস্থান অনুযায়ী তৃতীয় নিকটবর্তী গ্রহ, আবার আয়তনের ভিত্তিতে পৃথিবী শিলাপ্রধান গ্রহগুলির মধ্যে বৃহত্তম গ্রহ। পৃথিবীতে আমরা, আমাদের পূর্বপুরুষ, তাদের পূর্বপুরুষ এভাবে প্রায় ২.৪-১.৪ মিলিয়ন (১ মিলিয়ন = ১০ লক্ষ) বছর পূর্বে উত্তর ও পূর্ব আফ্রিকার প্রাচীন মনুষ্য প্রজাতি হোমো হ্যাবিলিস (Homo Habilis) বা ‘হ্যান্ডি ম্যান’ (Handy Man)-এর সময়কাল থেকে পৃথিবীকে দেখে আসছে। পায়ের তলার দিকে তাকালেই পৃথিবী দেখা যায়। তাই কে কখন পৃথিবী আবিষ্কার করেছে, তা প্রশ্ন করা হাস্যস্পদ। তবে গ্রহরূপে পৃথিবীর আবিষ্কারকে করেছেন সে বিষয়টির খোঁজ করলে দেখা যায় যে, ১৫১৫ সালে নিকোলাস কোপারনিকাস প্রথম প্রস্তাব করেন যে মঙ্গল ও শনির মতো পৃথিবীও একটি গ্রহ। তিনি তাঁর এই বক্তব্যের সমর্থনে ১৫৪৩ সালে প্রকাশিত তাঁর ‘De Revolutionibus Orbium Coelestium’ (ইংরেজি : On the Revolutions of the Heavenly Spheres) নামক গ্রন্থে সৌর মণ্ডলের হেলিওসেন্ট্রিক মডেল (Heliocentric Model) উপস্থাপন করেন এবং এর মাধ্যমে তিনি প্রমান করেন যে সূর্যকে কেন্দ্র করে বাকি গ্রহগুলি আবর্তন করছে এবং তাদের মধ্যে পৃথিবীও রয়েছে। পরবর্তী সময়ে জোহানস কেপলার (১৬০৯), গ্যালিলিও গ্যালিলেই (১৬১০) এবং স্যার আইজ্যাক নিউটন (১৬৮৭) তাঁদের কার্যাবলীর মাধ্যমে কোপারনিকাসের হেলিওসেন্ট্রিক মডেলকে সুদৃঢ় রূপে প্রতিষ্ঠিত করেন। ফলে বলাই যায়, ষোড়শ শতকে কোপারনিকাস দ্বারা গ্রহরূপে পৃথিবী আবিষ্কৃত হয়। ১৯৬১ সালে ইউরি গ্যাগারিন সর্বপ্রথম মহাকাশ থেকে পৃথিবীকে পর্যবেক্ষণ করেন। আর আজ থেকে প্রায় ৫২ বছর পূর্বে অ্যাপেলো-১১ অভিযান (১৬ ই জুলাই, ১৯৬৯ – ২৪ শে জুলাই, ১৯৬৯) -এর সময় মিশনের তিন অভিযাত্রী নীল আর্মস্ট্রং, বাজ অলড্রিন ও মাইকেল কলিন্স ১৯৬৯ সালের ১৬ ই জুলাই পৃথিবীকে প্রথম চাঁদ থেকে পর্যবেক্ষণ করেন।

আকৃতিগতভাবে পৃথিবী অনেকটা কমলা লেবুর গোলাকার আকৃতির মতো, যাকে ‘Oblate Spheroid’ বলা হয়, এই আবার উপবৃত্তাকার (Ellipsoid) আকৃতির একটি বিশেষ বিভাগ। বিজ্ঞানীরা পৃথিবীর আকৃতিকে কারো সাথে তুলনা না করে, ‘পৃথিবীর আকৃতি পৃথিবীর মতো’ (Geoid) হিসাবে ব্যখ্যা করতে অধিক আগ্রহী। পৃথিবীর নিরক্ষীয় ব্যাস (Equatorial Diameter) ৬৩৭৮.১ কিমি এবং মেরু ব্যাস (Polar Diameter) ৬৩৫৬.৮ কিমি। অর্থাৎ উভয় ব্যাসার্ধের মধ্যে পার্থক্য প্রায় ৪২ কিমি। পৃথিবীর নিরক্ষীয় পরিধি (Equatorial Circumference) ৪০,০৩০ কিমি। ১৮২৮ সালে জার্মান গণিতজ্ঞ জোহান কার্ল ফ্রেডরিক গাউস (Johann Carl Friedrich Gauss) প্রথম গাণিতিক ভাবে পৃথিবীর আকৃতি বর্ণনা করেন। পৃথিবীর আকৃতি লক্ষ্য করলে দেখা যায় পৃথিবীর ঘূর্ণন বলের প্রভাবে নিরক্ষীয় অঞ্চল বরাবর সমুদ্রের জলরাশি বহির্মূখী শক্তির প্রভাবে বাইরের দিকে নির্গত হওয়ার চেষ্টা করে কিন্তু মাধ্যাকর্ষণ শক্তির প্রভাবে তা সম্ভব হয় না। ফলে পৃথিবীর নিরক্ষীয় অঞ্চল সামান্য স্ফীত ও মেরু অঞ্চল কিছুটা চাপা প্রকৃতির হয়। পৃথিবীর এই আকৃতিকেই বিজ্ঞানীরা জিওড (Geoid) নামে অভিহিত করেন। ১৮৪৯ সালে আইরিশ গণিতজ্ঞ স্যার জর্জ গ্যাব্রিয়েল স্টোকস (Sir George Gabriel Stokes) “Surface of the Earth’s Original Fluidity” নির্ণয়ের গাণিতিক সূত্র প্রবর্তন করেন এবং জার্মান গণিতজ্ঞ জোহান বেনেডিক্ট লিস্টিং (Johann Benedict Listing) ১৮৭৩ সালে পৃথিবীর গাণিতিক ক্ষেত্র বর্ণনা প্রসঙ্গে ‘Geoid’ শব্দটি ব্যবহার করেন। কোন বস্তুর ঘূর্ণন বলের প্রভাবে সৃষ্ট বহির্মূখী শক্তি ও মাধ্যাকর্ষণ বলের প্রভাবে সৃষ্ট অন্তর্মুখী শক্তির প্রভাবে ওই বস্তুর তরল অংশ যে আকৃতি ধারণ করে সেই আকৃতিকে ‘Geoid’ বলা হয়।

সূর্য থেকে পৃথিবী গড়ে ১৪,৯৬,০০,০০০ কিমি দূরে অবস্থান করছে। সূর্য থেকে পৃথিবীতে সূর্যের আলো পৌঁছাতে সময় লাগে প্রায় 499.0 সেকেন্ড বা 8.3 মিনিট। উপবৃত্তাকার কক্ষপথে পৃথিবী ও সূর্যের সর্বনিম্ন (অনুসূর/Perihelion) দূরত্ব প্রায় ১৪ কোটি ৭১ লক্ষ কিমি এবং সর্বাধিক দূরত্ব (অপসূর/Aphelion) প্রায় ১৫ কোটি ২১ লক্ষ কিমি। পৃথিবী সূর্যকে উপবৃত্তাকার ৯৪,২০,০০,০০০ কিমি দীর্ঘ কক্ষপথে সৌর মণ্ডলের তৃতীয় দ্রুততম গ্রহ হিসাবে প্রায় ১,০৭,২০৮ কিমি/ঘণ্টা (২৯.৭৮ কিমি/সেকেন্ড) বেগে প্রদক্ষিণ করে চলেছে। এই দূরত্ব পরিক্রমে পৃথিবীর সময় লাগে প্রায় ৩৬৫ দিন (৩৬৫.২৫ দিন বা ৩৬৫ দিন, ৫ ঘণ্টা, ৪৮ মিনিট ও ৪৬ সেকেন্ড) বা ৮৭৬৬ ঘণ্টা। আবার নিজের অক্ষে ২৩.৪° কোণে হেলে প্রায় ১৬৭০ কিমি/ঘণ্টা গতিতে আবর্তিত হচ্ছে। পৃথিবীর আবর্তন কাল প্রায় ২৪ ঘণ্টা (২৩ ঘণ্টা, ৫৬ মিনিট ও ০৪ সেকেন্ড) বা ৮৬,৪০০ সেকেন্ড। পৃথিবীর আবর্তন বেগ সর্বত্র সমান নয়। পৃথিবীর নিরক্ষীয় অঞ্চলে (০ ডিগ্রি) আবর্তন বেগ ১৬৭০ কিমি/ঘণ্টা হলেও, অক্ষাংশ বৃদ্ধিতে এই গতি কমতে থাকে এবং উভয় মেরুতে প্রায় শূন্য হয়। উভয় গোলার্ধে প্রতি ১০ ডিগ্রি অক্ষাংশে পৃথিবীর আবর্তন দেখলে, ১০ ডিগ্রি উত্তর ও দক্ষিণে এই গতি ১৬৪৪.৪ কিমি/ঘণ্টা, ২০ ডিগ্রি উত্তর ও দক্ষিণে ১৫৬৯.১ কিমি/ঘণ্টা, ৩০ ডিগ্রি উত্তর ও দক্ষিণে ১৪৪৬.১ কিমি/ঘণ্টা, ৪০ ডিগ্রি উত্তর ও দক্ষিণে ১২৭৯.১ কিমি/ঘণ্টা, ৫০ ডিগ্রি উত্তর ও দক্ষিণে ১০৭৩.৩ কিমি/ঘণ্টা, ৬০ ডিগ্রি উত্তর ও দক্ষিণে ৮৩৪.৯ কিমি/ঘণ্টা, ৭০ ডিগ্রি উত্তর ও দক্ষিণে ৫৭১.১ কিমি/ঘণ্টা, ৮০ ডিগ্রি উত্তর ও দক্ষিণে ২৮৯.৯৫ কিমি/ঘণ্টা এবং উভয় মেরুতে প্রায় শূন্য। পৃথিবীর যেকোনো অক্ষাংশের আবর্তন গতিবেগ cos(Latitude) x ১৬৭০ কিমি/ঘণ্টা দ্বারা নির্ণয় করা যায়। পৃথিবীর ঘনত্ব ৫.৫১ গ্রাম/ঘনমিটার। ঘনত্বের বিচারে পৃথিবী সৌরমণ্ডলের সর্বাধিক ঘনত্বযুক্ত গ্রহ। অন্যদিকে পৃথিবীর আকর্ষণ বল প্রায় ৯.৮০৭ মিটার/বর্গ সেকেন্ড। এই আকর্ষণ বল নিয়ে বৃহস্পতি, নেপচুন ও শনির পরেই চতুর্থ স্থান দখল করেছে পৃথিবী।

আমরা সাধারণভাবে পৃথিবীর অভ্যন্তরীণ ভাগের গঠন বিন্যাস দেখতে পাই না, কিন্তু ভূ-বিজ্ঞানীগণ বিভিন্ন উপায়ে ভূ-অভ্যন্তরীণ গঠন বর্ণনা করেছেন। এই উপায়গুলির মধ্যে প্রধান গুরুত্বপূর্ণ বিষয়টি হল ভূ-কম্প তরঙ্গ (Seismic Waves) এর গতিবিধির পর্যবেক্ষণ। প্রায় তিন শতাব্দী (১৭০০) পূর্বে, স্যার আইজ্যাক নিউটন পৃথিবীর অভ্যন্তরভাগ সম্পর্কে গাণিতিকভাবে ব্যখ্যা করেন যে, পৃথিবীর গভীরে ঘন বস্তুর অস্তিত্ব রয়েছে। এ থেকেই শুরু, পরবর্তী সময়ে ১৮৮০ সালে সিসমোগ্রাফ আবিষ্কারের পর বিভিন্ন বিজ্ঞানী ভূকম্পন তরঙ্গ ও তাদের গতিপ্রকৃতি অধ্যায়ন করে পৃথিবীর অভ্যন্তরীণ ভাগের গঠন বিন্যাস সমন্ধে তথ্য তুলে ধরেন। ১৯০৬ সালে আর. ডি. ওল্ডহ্যাম ভূ-অভ্যন্তরীণ স্তরগুলির মধ্যে কেন্দ্রমণ্ডল সম্পর্কে প্রথম ধারণা দেন। সামগ্রিকভাবে পৃথিবীর অভ্যন্তরকে তিনটি প্রধান স্তর যথা : কেন্দ্র (Core), গুরুমণ্ডল (Mantle) এবং ভূত্বক (Crust) এ ভাগ করা হলেও, ভূ-অভ্যন্তরীণ গঠনের Mechanical Properties এবং Chemical Properties এর ভিত্তিতে আমরা বেশ কয়েকটি স্তরের কথা জানতে পেরেছি, Mechanical Properties এর ভিত্তিতে জ্ঞাত স্তরগুলি হল — শিলামন্ডল (Lithosphere), ক্ষুব্ধমন্ডল (Asthenosphere), মেসোস্ফেরিক ম্যান্টল (Mesospheric Mantle), বহিঃকেন্দ্রমন্ডল (Outer Core) এবং অন্তঃকেন্দ্রমন্ডল (Inner Core)। আবার অন্যদিকে Chemical Properties এর ভিত্তিতে জ্ঞাত স্তরগুলি হল — ভূত্বক (Crust), উর্দ্ধ গুরুমন্ডল (Upper Mantle), নিম্ন গুরুমন্ডল (Lower Mantle), বহিঃকেন্দ্রমন্ডল (Outer Core) এবং অন্তঃকেন্দ্রমন্ডল (Inner Core)। ভূকম্পীয় তরঙ্গের গতিবিধির উপর ভিত্তি করে পৃথিবীর অভ্যন্তর ভাগকে যে তিনটি সমকেন্দ্রিক বলয়ে ভাগ করা হয়েছে তার উপর থেকে নীচের দিকে প্রথম ভাগ হল ভূত্বক। পৃথিবীর বহির্ভাগের পাতলা আস্তরণ হল এই অংশ, যা পৃথিবীর মোট ভর ও আয়তনের মাত্র ১% নিয়ে গঠিত হয়েছে। ভূত্বক মূলতঃ দুটি অংশে গঠিত হয়েছে, যথা, সামুদ্রিক ভূত্বক (Oceanic Crust) এবং মহাদেশীয় ভূত্বক (Continental Crust)। সামুদ্রিক ভূত্বক ৫ থেকে ১০ কিমি পুরু এবং মহাদেশীয় ভূত্বক ৩০-৫০ কিমি পুরু হয়ে থাকে। মহাদেশীয় ভূত্বক গঠনে ৬৫% সিলিকন (Si) এবং ৩৫% অ্যালুমিনিয়ামের (Al) উপস্থিতি লক্ষ্য করা যায় বলে এবং সামুদ্রিক ভূত্বক গঠনে ৪৫%-৫৫% সিলিকন (Si) এবং ৫৫%-৪৫% ম্যাগনেশিয়াম (Ma) লক্ষ্য করা যায় বলে, এডওয়ার্ড সুয়েস এই স্তর দুটিকে যথাক্রমে সিয়াল (SiAl) ও সীমা (SiMa) নামে অভিহিত করেন। ভূকম্পীয় তরঙ্গের গতিবিধির ভিত্তিতে সজ্জিত পৃথিবীর অভ্যন্তরীণ ভাগের তিনটি সমকেন্দ্রিক বলয়ের দ্বিতীয় প্রধান বলয়টি হল গুরুমন্ডল। ভূত্বকের নিম্ন থেকে প্রায় ২৯০০ পর্যন্ত প্রসারিত পৃথিবীর এই অভ্যন্তরীণ বলয়। ভূ-কম্পীয় তরঙ্গের গতিপ্রকৃতি অনুসারে গুরু মন্ডলকে দুটি ভাগে ভাগ করা যায়, যথা — (i) উর্ধ্ব গুরু মন্ডল (Upper Mantal) : মোহ বিযুক্তি থেকে ১০০০ কিমি গভীরতা পর্যন্ত বিস্তৃত গুরুমন্ডলীয় অংশ এবং (ii) নিম্ন গুরু মন্ডল (Lower Mantal) : উর্ধ্ব গুরু মন্ডলের নিম্নাংশ (১০০০ কিমি) থেকে বহিঃকেন্দ্রমন্ডল পর্যন্ত অর্থাৎ ২৯০০ কিমি গভীরতা পর্যন্ত বিস্তৃত গুরুমন্ডলীয় অংশ। ভূকম্পীয় তরঙ্গের গতিবিধির ভিত্তিতে সজ্জিত পৃথিবীর অভ্যন্তরীণ ভাগের তিনটি সমকেন্দ্রিক বলয়ের তৃতীয় প্রধান বলয়টি হল কেন্দ্রমন্ডল। ভূঅভ্যন্তরে ২৯০০ কিমি থেকে ৬৩৭১ কিমি পর্যন্ত বিস্তৃত এই স্তরের বিস্তার। কেন্দ্রমন্ডলকে দুটি ভাগে ভাগ করা যায়, যথা – (i) ২৯০০ কিমি থেকে ৫১৫০ কিমি পর্যন্ত বিস্তৃত বহিঃকেন্দ্র মন্ডল (Outer Core) এবং (ii) লেহম্যান বিযুক্তি (৫১৫০ কিমি) থেকে ৬৩৭১ কিমি পর্যন্ত বিস্তৃত অন্তঃকেন্দ্র মন্ডল (Inner Core)।

পৃথিবী সৌরমণ্ডলের তৃতীয় উষ্ণতম এবং পঞ্চম শীতলতম গ্রহ। ২০১৫ সালের প্রদত্ত তথ্য অনুযায়ী পৃথিবী পৃষ্ঠের গড় তাপমাত্রা প্রায় ১৫°C। পৃথিবী পৃষ্ঠের সর্বনিম্ন নথিভুক্ত ভূপৃষ্ঠস্থ উষ্ণতা -৮৯.২°C (ভোস্টক স্টেশন, আন্টার্কটিকা) এবং সর্বোচ্চ উষ্ণতা ৫৬.৭°C (ফার্নেস ক্রিক, USA)। পৃথিবীর পৃষ্ঠদেশীয় ভূমিরূপ বৈচিত্রময়। পৃথিবীপৃষ্ঠকে লক্ষ্য করলে দেখা যায় এখানে বৃহদাকার দুটি প্রধান ভূতাত্বিক বৈশিষ্ট্য বিরাজমান, যার একটি হল — মহাদেশ ও অন্যটি হল মহাসাগর। মহাদেশ মূলতঃ স্থলভাগ নিয়ে গঠিত আবার মহাসাগর জল ভাগের ধারক। এই দুই ভূতাত্ত্বিক ক্ষেত্রই আবার বৈচিত্র্যপূর্ণ ভূমিরূপের সমন্বয়ে গঠিত হয়েছে। শতাংশ হিসাবে দেখলে, পৃথিবীর মোট আয়তনের ৩০ শতাংশ অঞ্চলে মহাদেশ এবং প্রায় ৭০ শতাংশ অঞ্চলে মহাসাগর গড়ে উঠেছে। পৃথিবীর পৃষ্ঠদেশীয় প্রধান মহাদেশীয় ভূমিরূপগুলি হল — (i) সমভূমি (Plains) (ii) মালভূমি (Plateaus) ও (iii) পর্বত (Mountains)। পৃথিবীর মহাদেশীয় পৃষ্ঠের প্রায় ৫৫% এলাকা জুড়ে সমভূমি, ১৮% এলাকা জুড়ে মালভূমি এবং প্রায় ২৭% অঞ্চল জুড়ে পর্বত অবস্থান করছে। মহাদেশীয় ক্ষেত্রে যে সমস্ত ভূমিভাগের উচ্চতা সমুদ্র পৃষ্ঠ থেকে গড় ৩০০ মিটারের মধ্যে এবং বিস্তৃত অঞ্চল জুড়ে পরিব্যাপ্ত সেই সমস্ত ভূমিভাগকে বলা হয় সমভূমি। বিশ্বের প্রায় 80% মানুষ সমভূমি অঞ্চলে বসবাস করে থাকে এবং মানুষের জীবনধারণ, কর্মক্ষেত্র, পরিবহন, খাদ্য উৎপাদন ইত্যাদি বিষয়গুলির প্রধান ধারক হল সমভূমি। সমভূমিকে ‘Food Baskets of the World’ অর্থাৎ বিশ্বের খাবারের ঝুড়ি হিসাবে অভিহিত করা হয়। সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে গড় ৬০০-৯০০ মিটারের মধ্যে এবং বিস্তৃত অঞ্চল জুড়ে পরিব্যাপ্ত হওয়ার পর কোন দিকে খাড়াভাবে বা ঢালু ভাবে নেমে আসে, সেই সমস্ত ভূমিভাগকে বলা হয় মালভূমি। পৃথিবীর প্রায় ৭-৮% মানুষ মালভূমি অঞ্চলে বসবাস করে। মালভূমি অঞ্চল মূলতঃ খনিজ সম্পদের ভান্ডার হিসাবে বিবেচিত হয়। পৃথিবীর বৃহত্তম মালভূমি হল মধ্য এশিয়ার তিব্বত মালভূমি যা ২৫ লক্ষ বর্গকিমি অঞ্চল জুড়ে পরিব্যাপ্ত রয়েছে। সমুদ্র পৃষ্ঠ থেকে ৯০০ মিটারের অধিক উচ্চতা যুক্ত, খাড়া ঢাল ও সূচালো মস্তক যুক্ত বিস্তৃত উচ্চভূমিভাগকে পর্বত বলা হয়। UN Food and Agriculture Organization এর মতে পৃথিবীর প্রায় ১২% মানুষ পর্বত বা পার্বত্যাঞ্চলে বসবাস করে। পৃথিবীর ৮০% পৃষ্ঠীয় বিশুদ্ধ পানীয় জলের জোগান দেয় পর্বত। পৃথিবীতে চার ধরনের পর্বত দেখা যায়, যথা — ভঙ্গিল পর্বত (Fold Mountains), স্তূপ পর্বত (Block Mountains), আগ্নেয় পর্বত (Volcanic Mountains) এবং ক্ষয়জাত পর্বত (Residual Mountains)। স্থলভাগে পৃথিবীর দীর্ঘতম পর্বত হল অন্দিজ পর্বত যা ৭০০০ কিমি দীর্ঘ এবং উচ্চতম পর্বত হল হিমালয় পর্বত, যার সর্বোচ্চ উচ্চতা ৮৮৪৮ মিটার (Mount Everest)।

মহাসাগরীয় তলদেশের ভূপ্রকৃতি এক বৈচিত্রময় অবস্থা। মহাদেশীয় অংশ বা উপকূল থেকে গভীর সমূদ্র পর্যন্ত অংশে এই বৈচিত্র ধরা পড়ে। উপকূল থেকে যতই গভীর সমূদ্রে যাওয়া যায় ততই গভীরতা বাড়তে থাকে, এই গভীরতার ভিত্তিতে সমূদ্র তলদেশকে প্রধান চারটি ভাগে ভাগ করা যায়, যথা — (i) মহীসোপান (Continental Shelf), (ii) মহীঢাল (Continental Slope), (iii) গভীর সমুদ্রের সমভূমি (Deep Sea Plains) এবং (iv) অন্য ভূমিরুপ (Others Features)। ভূখণ্ড সন্নিহিত সমূদ্রে নিমজ্জিত প্রায় ২০০ মিটার গভীরতা পর্যন্ত বিস্তৃত মৃদুঢাল বিশিষ্ট মহাদেশীয় প্রান্তভাগকে মহীসোপান বলা হয়। সমুদ্র তলদেশের প্রায় ৮.৬% এলাকা দখল করে রয়েছে মহীসোপান। ইহা খনিজ সম্পদ, বাণিজ্যিক মৎস্য ক্ষেত্র, প্রবাল দ্বীপ ও প্রবাল প্রাচীরের ধারক। মহীসোপানের শেষপ্রান্ত থেকে নিমজ্জিত ভূভাগের যে অংশ খাড়া ঢালে ২০০ মিটার গভীরতা থেকে প্রায় ২০০০ মিটার গভীরতা পর্যন্ত নেমে গিয়ে গভীর সামুদ্রিক সমভূমিতে মিশেছে সমুদ্র তলদেশের সেই অংশকে বলা হয় মহীঢাল। ইহা মহাদেশীয় অংশের শেষসীমা। সমুদ্র তলদেশের প্রায় ৮.৫% এলাকা অধিকার করে আছে মহীঢাল। ইহা মহাসাগরীয় শিলা বা সীমা দ্বারা গঠিত। মহীঢাল সবুজ, কালো, নীল রঙের কাদা ; পাইরাইট, গ্লুকোনাইট ইত্যাদি খনিজ এবং বিভিণ্ন পলির ধারক। মহীঢালের পর থেকে মহাসাগরের তলদেশের প্রায় সমতল বিস্তীর্ণ অংশকে গভীর সমুদ্রের সমভূমি বলে। এই সমভূমির গভীরতা ২০০০ মিটার থেকে ৬০০০ মিটার পর্যন্ত হয়ে থাকে। সমুদ্র তলদেশের প্রায় ৮২.৭% অংশ জুড়ে এরুপ সমভূমি অবস্থান করছে। এই অংশে জলমগ্ন শৈলশিরা, মালভূমি, সমুদ্র খাত, আগ্নেয়গিরি, অসংখ্য দ্বীপ দেখা যায়। সমুদ্রের এই অংশ ব্যাসল্ট বা ব্যাসল্ট জাতীয় আগ্নেয় শিলা দ্বারা গঠিত। গভীর সামুদ্রিক সমভূমিতে সল্প বিস্তীর্ণ স্থানে সৃষ্ট দীর্ঘাকার, গভীর, খাড়া ঢাল বিশিষ্ট এবং অত্যন্ত অপ্রশস্ত পরিখার মতো অবনত ভূভাগ গভীর সমূদ্র খাত নামে পরিচিত। গভীর সমুদ্রখাত সমুদ্র তলদেশের প্রায় ১.৪% এলাকা অধিকার করে রয়েছে। এদের প্রস্থ 100 মিটার, দৈর্ঘ্য ক্ষেত্র বিশেষে ১০০০ কিমিরও বেশী এবং গভীরতা সর্বাধিক ১১,০৩৩ মিটার (মারিয়ানা খাতের চ্যালেঞ্জার ডেপথ)। সাধারণত পাত সীমান্ত অঞ্চল, আগ্নেয়গিরি ও ভূকম্পন প্রবণ অঞ্চলে এরূপ খাত গড়ে উঠেছে। মহাসাগরে লক্ষ্যণীয় অনান্য ভূমিরূপের মধ্যে অন্যতম হল — সামুদ্রিক শৈলশিরা (Oceanic Ridges), গভীর সমুদ্রের সমভূমি অংশে সমুদ্রের মাঝ বরাবর নিরবিচ্ছিন্ন ভাবে বিস্তৃত জলমগ্ন পাহাড়, আগ্নেয়গিরি ও শৈলশিরাকে সামুদ্রিক শৈলশিরা বলে। পৃথিবীব্যাপী সামুদ্রিক শৈলশিরার দৈর্ঘ্য প্রায় ৮৪০০০ কিমি। শৈলশিরা সমুদ্র তলদেশের প্রায় ৩.২% অংশ জুড়ে বিস্তৃত। প্রতিসারী পাত সীমানা বরাবর লাভা দ্বারা সৃষ্ট শৈলশিরার অক্ষ বরাবর অসংখ্য ফাটল, চ্যুতি, গ্রস্ত উপত্যকা প্রভৃতি লক্ষ্য করা যায়। আটলান্টিক মহাসাগরে ‘S’ আকৃতিতে বিস্তৃত মধ্য আটলান্টিক শৈলশিরার দৈর্ঘ্য প্রায় ১৪,৪৫০ কিমি।

পৃথিবীর মাধ্যাকর্ষণ শক্তির প্রভাবে ঘন ও সুবিস্তৃত বায়ুমণ্ডল পৃথিবীকে বেষ্টন করে রয়েছে। এই বায়ুমণ্ডল মূলতঃ ৭৮.০৮% নাইট্রোজেন, ২০.৯৫% অক্সিজেন, ০.৯৩% আর্গন, ০.০৪% কার্বনডাই অক্সাইড দ্বারা গঠিত, এছাড়া সামান্য পরিমানে জলীয়বাষ্প সহ অন্যান্য গ্যাসের উপস্থিতিও পরিলক্ষিত হয়। পৃথিবীর বায়ুমণ্ডল প্রায় ১০০০০ কিমি বিস্তৃত হলেও বায়ুমণ্ডলের মুখ্যভাগ বা তিন চতুর্থাংশ প্রায় ১১ কিমি উচ্চতার মধ্যেই সীমাবদ্ধ। বায়ুমণ্ডলের মোট ভরের ৫০% ৫.৬ কিমির নিম্নে রয়েছে, পরবর্তী ৪০% রয়েছে ১৬ কিমির মধ্যে। অর্থাৎ মোট ভরের ৯০% ভরই ১৬ কিমি উচ্চতার মধ্যেই সীমাবদ্ধ। অবশিষ্ট ১০% এর মধ্যে ৯৯.৯৯৯৯৭% ভর ১০০ কিমির মধ্যে রয়েছে। সাধারণ ভাবে পৃথিবীর বায়ুমণ্ডলকে উচ্চতার নিরিখে পাঁচটি প্রধান ভাগে ভাগ করা যায়, নিম্ন থেকে ঊর্ধ্বে এই স্তরগুলি হল — (i) ট্রপোস্ফিয়ার : ০ থেকে ১২ কিমি, (ii) স্ট্র্যাটোস্ফিয়ার : ১২ থেকে ৫০ কিমি, (iii) মেসোস্ফিয়ার : ৫০ থেকে ৮০ কিমি, (iv) থার্মোস্ফিয়ার : ৮০ থেকে ৭০০ কিমি এবং (v) এক্সোস্ফিয়ার : ৭০০ থেকে ১০০০০ কিমি। পৃথিবীর বায়ুমণ্ডলের গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা চক্র হল বৃষ্টিপাত। পৃথিবী থেকে জলীয়বাষ্প বায়ুমণ্ডলে উঠে শীতল হয়ে আবার ভূপৃষ্ঠে নেমে আসে এবং চক্রাকারে এই ঘটনা চলতে থাকে। বায়ুমণ্ডলের এই ঘটনার ফলেই পৃথিবী জীবের আবাসস্থল হিসাবে নিজেকে বিকশিত করতে পেরেছে। সৌর মণ্ডলের একমাত্র গ্রহ পৃথিবী যেখানে জীবনের অস্তিত্ব রয়েছে। পৃথিবীর সামুদ্রিক অংশ নীল, কৃষিভূমি ও পতিতভূমি বাদামি, বনভূমি সবুজ এবং মেরু অঞ্চল সাদা রঙের হয়ে থাকে। তবে এক্ষেত্রে পৃথিবীর প্রায় তিনভাগ সমুদ্র দ্বারা পরিবেষ্টিত হওয়ায় সেই রঙ অনুযায়ী পৃথিবীকে নীল গ্রহ (Blue Planet) হিসাবে অভিহিত করা হয়। মহাকাশ থেকে পৃথিবী নীল গ্রহ রূপেই পরিলক্ষিত হয়।


লেখকঃ- গোপাল মণ্ডল (চৌবাট্ট, বাঁকুড়া)
[লেখক মিশন জিওগ্রাফি ইন্ডিয়ার সহকারী সম্পাদক]

তথ্যসূত্রঃ- Wikipedia ; Our Solar Systems : NASA ; Universe Today ; Travel & Leisure ; Apollo 11 & 17 Mission : NASA ; Science Direct ; Britannica

প্রথম প্রকাশঃ- ভূগোলিকা ফেসবুক পেজ, চতুর্থ বর্ষপূর্তি-৩০/০৩/২০২১

©ভূগোলিকা-Bhugolika
©মিশন জিওগ্রাফি ইন্ডিয়া

Content Protection by DMCA.com
এখান থেকে শেয়ার করুন
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  

মন্তব্য করুন

error: মিশন জিওগ্রাফি ইন্ডিয়া কর্তৃক সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত