উত্তরবঙ্গ ও সংলগ্ন অঞ্চলের রেল ইতিহাস

উত্তরবঙ্গ ও সংলগ্ন অঞ্চলের রেল ইতিহাস

ভারতীয় জনজীবনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অংশগুলির একটা হল ভারতীয় রেল। বিশ্বের চতুর্থ বৃহত্তম রেলজালিকা, কেবল যাতায়াতের একটা সাধন নয়, ভারতীয় জনসাধারণের আবেগ ও স্বাভিমানের জায়গাও বটে। ভারতীয় রেলের ১৭৬ বছরের ইতিহাসের পাতা ঘাঁটলে, পাওয়া যাবে উত্থান ও পতনের নানা কাহিনী।

উত্তরবঙ্গের রেল মানচিত্র, অনেকটা উত্তরবঙ্গের নদীগুলোর মতোই, সময়ের সাথে সাথে তার গতিপথের বারংবার পরিবর্তন হয়েছে। তবে উত্তরবঙ্গের রেল মানচিত্রে আমূল পরিবর্তন আসে, স্বাধীনতা আর দেশভাগের পর। বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়া উত্তর-পূর্ব ভারতকে, দেশের সাথে জোড়ার লক্ষ্যে, নতুন করে পাতা হয় রেলপথ। বিস্তর সেই ভাঙাগড়ার খেলার খানিকটা, এই প্রবন্ধে দেওয়া হল।

★ স্বাধীনতা-পূর্ব পরিস্থিতি :

(১) কলকাতা-শিলিগুড়ি রেলপথ :- উত্তরবঙ্গের প্রথম রেল যোগাযোগ স্থাপন হয়, যখন নর্থ বেঙ্গল স্টেট রেলওয়ে (NBSR) নামক রেল কোম্পানি, আত্রাই (বর্তমানে বাংলাদেশে) থেকে জলপাইগুড়ি পর্যন্ত মিটার গেজ রেলপথ স্থাপন করে ২৮ শে আগষ্ট, ১৮৭৭। পরবর্তী কালে, ১৮৭৮ সালের ১৫ ই জানুয়ারি, অধুনা বাংলাদেশের পাবনা জেলায়, পদ্মাপাড়ের সাঁড়া ঘাট স্টেশন থেকে আত্রাই পর্যন্ত মিটার গেজ রেলপথ স্থাপন হয়। ওই বছরের ১০ই জুন, জলপাইগুড়ি থেকে শিলিগুড়ি (বর্তমান শিলিগুড়ি টাউন) পর্যন্ত মিটার গেজ রেলপথ সম্প্রসারিত হয়ে যায়। অর্থাৎ ১৮৭৮ সালেই, সাঁড়া ঘাট থেকে শিলিগুড়ি পর্যন্ত কোনো গাড়ি বদল না করেই সরাসরি মিটার গেজ ট্রেনে পৌঁছে যাওয়ার বন্দোবস্ত সম্পূর্ণ হয়। অন্যদিকে ইস্টার্ন বেঙ্গল স্টেট রেলওয়ে, বা প্রকারান্তরে, ইস্টার্ন বেঙ্গল রেলওয়ে (EBSR বা EBR), ১৯ শে জানুয়ারি ১৮৭৮ সালে, সাঁড়া ঘাটের দক্ষিণে, পদ্মার ঠিক উল্টো পাড়ে ভেড়ামারা পর্যন্ত ব্রড গেজ রেলপথ স্থাপন করে। এর ফলে কলকাতার থেকে ভেড়ামারা পর্যন্ত সরাসরি রেল যোগাযোগ স্থাপন হয়ে যায়। ১৮৭৮ সালে, এই দুই রেলখন্ড চালু হওয়ার ফলে প্রথমবারের জন্য তরাই-ডুয়ার্স অঞ্চল কলকাতার সঙ্গে রেল মারফত জুড়ে যায়, যদিও তা কিন্তু সরাসরি রেল যোগাযোগ ছিল না। কলকাতা থেকে ভেড়ামারার দামুকদিয়া ঘাট পর্যন্ত ১৮৪.৯ কিলোমিটার দীর্ঘ ব্রড গেজ ট্রেন, তারপর ‘সাঁড়া ঘাট ফেরী’ নামক নৌকাব্যবস্থায়, বিপুলা পদ্মাকে অতিক্রম করে, অপর পাড়ে, সাঁড়া ঘাট থেকে মিটার গেজ ট্রেনে, প্রায় ৩৬৩.১ কিলোমিটার পথ পাড়ি দিয়ে শিলিগুড়ি পৌঁছে যাওয়া যেতো। এই ব্যবস্থা স্থায়ী হয়, ১৯১৫ সাল অবধি। ১৯১৫ সালে পদ্মার উপর স্থাপনা হয়, সুবিখ্যাত ‘হার্ডিঞ্জ ব্রীজ’-এর, যার ফলে পদ্মার দুই পারের মধ্যে, কোনোরকম বাঁধা ছাড়াই অনায়াসে, সরাসরি রেল চলাচল করতে পারে।

এরই মধ্যে ১৮৮৭ সালে NBSR সম্পূর্ণরূপে EBR এর মধ্যে মিশে যায়। ফলে কলকাতা থেকে শিলিগুড়ি, সমগ্র রেলপথটাই চলে আসে, EBR-এর নিয়ন্ত্রণের অধীনে। হার্ডিঞ্জ সেতু চালু হবার আগে, পদ্মার উত্তর পাড়ে, শিলিগুড়িগামী লাইনকে মিটার গেজ থেকে ব্রড গেজে রূপান্তরিত করার প্রক্রিয়া চালু হয়ে যায়। ১৯১৪ সালের ১ লা নভেম্বরে, সান্তাহার পর্যন্ত ব্রড গেজ লাইন নির্মাণ হয়ে যায়। ১ লা জুলাই ১৯২৪ সালে পার্বতীপুর পর্যন্ত এবং, ৩০ শে সেপ্টেম্বর ১৯২৬ সালে শিলিগুড়ি পর্যন্ত ব্রডগেজ লাইন নির্মাণ সম্পূর্ণ হয়। অর্থাৎ ১৯২৬ সালে, কলকাতা থেকে শিলিগুড়ি সহ অবিভক্ত উত্তরবঙ্গের সরাসরি ব্রডগেজ লাইন মারফত রেল যোগাযোগ ব্যবস্থা চালু হয়ে যায়‌। কলকাতা (শিয়ালদহ) থেকে নৈহাটি, রানাঘাট, দর্শনা, পোড়াদহ, ঈশ্বরদী, আব্দুলপুর, সান্তাহার, পার্বতীপুর, চিলাহাটি, হলদিবাড়ি, জলপাইগুড়ি হয়ে এই লাইন শিলিগুড়ি পৌঁছে যেতো। মজার ব্যাপার হল, স্বাধীনতা ও দেশভাগ পর্যন্ত, এই লাইনই ছিল তৎকালীন অবিভক্ত বাংলার উত্তরাংশের একমাত্র ব্রডগেজ লাইন। দেশভাগের পর, শিয়ালদহ থেকে গেদে, ও হলদিবাড়ি থেকে শিলিগুড়ি অংশ ভারতের ভূভাগে চলে আসে, ও দর্শনা থেকে চিলাহাটি পর্যন্ত অংশ পাকিস্তান, ও ১৯৭১ পরবর্তী কালে বাংলাদেশের অন্তর্গত হয়। দেশভাগ হয়ে গেলেও, ১৯৬৫ সালের ভারত-পাক যুদ্ধ অবধি, এই রেলপথ সচল ছিল। দর্শনা থেকে চিলাহাটি পর্যন্ত রেলপথ, আজ অবধি ব্রডগেজ লাইন হয়েই রয়েছে। একইরকম ভাবে শিয়ালদহ-গেদে সেকশনও ব্রডগেজ হিসেবেই আজ পর্যন্ত পরিচালিত হয়ে আসছে। ব্যতিক্রম কেবল হলদিবাড়ি-শিলিগুড়ি সেকশন। ভারতের উত্তরবঙ্গ অংশ ও উত্তর-পূর্ব ভারতের বাকি সমস্ত রেললাইন মিটার গেজ হওয়ার দরুন, কেবলমাত্র শিলিগুড়ি থেকে হলদিবাড়ি ব্রডগেজ লাইনে রেলের যাতায়াতে অসুবিধা দেখা দেয়, এবং ফলস্বরূপ, ১৯৪৯ সালে এই রেলপথকে মিটার গেজে রূপান্তরিত করা হয়। ১৯৬০-এর দশকে ভারতীয় রেলে উত্তরবঙ্গে ব্রডগেজের পুনঃআগমন আছে, তখন শিলিগুড়ি থেকে হলদিবাড়ি ফের ব্রডগেজে বদলানো হয়। অর্থাৎ শিলিগুড়ি-হলদিবাড়ি সেকশনের ইতিহাসে, তিন বার গেজ পরিবর্তন হয়েছে। বর্তমানে এই সেকশনের আমবাড়ি-ফালাকাটা ও শিলিগুড়ি টাউনের মধ্যবর্তী অংশে আর কোনো রেলপথ নেই।

(২) অসম মেন লাইন :- অসম বেহার স্টেট রেলওয়ে (ABSR) কর্তৃক ১৮৮৩ সাল থেকে ১৮৮৯ সালের মধ্যবর্তী সময়কালে, পার্বতীপুর থেকে পশ্চিমে বেঙ্গল অ্যান্ড নর্থ ওয়েস্টার্ন রেলওয়ের গায়ে অবস্থিত কাটিহার পর্যন্ত মিটার গেজ লাইনের বিস্তার হয়। পার্বতীপুর থেকে চিরিরবন্দর, দিনাজপুর, বিরল, রাধিকাপুর, রায়গঞ্জ, বারসৈ হয়ে কাটিহার পর্যন্ত রেল লাইন, পরবর্তীকালে EBSR অধিগ্রহণ করে। ১৮৯২ সালে বারসৈ থেকেই কিষাণগঞ্জ পর্যন্ত একটা মিটার গেজ ব্রাঞ্চ রেলপথ চালু হয়। অন্যদিকে NBSR কর্তৃক ১৮৭৮-১৮৭৯ সময়কালে নির্মাণ হয়, পার্বতীপুর থেকে শ্যামপুর, রংপুর হয়ে কাউনিয়া পর্যন্ত মিটার গেজ রেলপথের। ১৮৮১ খৃষ্টাব্দে কাউনিয়া-ধরলা স্টেট রেলওয়ে কর্তৃক, কাউনিয়া থেকে ধরলা নদীর পাড়ে যাত্রাপুর পর্যন্ত ন্যারো গেজ রেলপথ নির্মাণ করা হয়। ১৮৮২ সালে তিস্তা জংশন থেকে লালমনিরহাট হয়ে মোগলহাট পর্যন্ত আরেকটা শাখা লাইন খোলা হয়। ১৮৮৭ সালে কাউনিয়া ধরলা স্টেট রেলওয়ে, EBR দ্বারা অধিগৃহীত হয়‌। ১৯০১ সালে কাউনিয়া-তিস্তা জংশন-লালমনিরহাট-মোগলহাট সেকশন, ন্যারোগেজ থেকে মিটারগেজে রূপান্তরিত হয়। বর্তমানে এই সেকশনের কাউনিয়া-লালমনিরহাট সেকশন চালু থাকলেও, লালমনিরহাট থেকে মোগলহাট সেকশন পরিত্যক্ত অবস্থায় পড়ে রয়েছে।
মোগলহাট থেকে লাইন ২রা জানুয়ারি ১৯০২ সালে পৌঁছয় তৎকালীন কোচবিহার রাজ্যের অন্তর্ভুক্ত গীতলদহ পর্যন্ত। বর্তমানে মোগলহাট থেকে গীতলদহ অংশও পরিত্যক্ত হয়ে গেছে। কেবল পড়ে রয়েছে, ধরলা নদীর উপর নির্মিত ভাঙা মিটার গেজ সেতুর অবশেষ। গীতলদহ জংশন স্টেশন উঠে গিয়ে, তার খানিক উত্তর পূর্বে নির্মিত হয়েছে নিউ গীতলদহ স্টেশন। গীতলদহ জংশন থেকে সোনাহাট হয়ে অসমের গোলোকগঞ্জে রেলপথ পৌঁছে যায়, সেপ্টেম্বর ১৯০২-তে, তারপর কোকরাঝাড়, সরভোগ হয়ে গুয়াহাটির উত্তরে, ব্রহ্মপুত্রের উত্তর পাড়ে নির্মিত আমিনগাঁও পর্যন্ত রেলপথ সম্প্রসারণ সম্পূর্ণ হয়, ১লা এপ্রিল ১৯০৯ সালে। বর্তমানে এই রেলপথের কাটিহার-রাধিকাপুর সেকশন ব্রডগেজ ও ভারতের অন্তর্ভুক্ত, বিরল-পার্বতীপুর সেকশন ব্রডগেজ ও বাংলাদেশের অংশ, আবার পার্বতীপুর-লালমনিরহাট মিটার গেজ সেকশন বাংলাদেশে পড়ে, লালমনিরহাট-মোগলহাট-গীতলদহ (গীতলদহ বাদে) পরিত্যক্ত সেকশনও পড়ে বাংলাদেশেই, গীতলদহ-বামনহাট সেকশন ব্রডগেজ ও ভারতের অংশ, বামনহাট-সোনাহাট-গোলোকগঞ্জ (বামনহাট ও গোলোকগঞ্জ ব্যাতিরেকে) পরিত্যক্ত সেকশন বাংলাদেশে, ও সর্বশেষ গোলকগঞ্জ থেকে বাকি অংশ ব্রডগেজ ও ভারতের অন্তর্ভুক্ত। স্বাধীনতাপূর্ব ভারতে উত্তর ভারত থেকে গুয়াহাটি (তৎকালীন গৌহাটি) পর্যন্ত যাওয়ার এটাই ছিল মেন লাইন। কাটিহার-বারসৈ-রায়গঞ্জ-দিনাজপুর-পার্বতীপুর-রংপুর-কাউনিয়া-লালমনিরহাট-গীতলদহ-গোলোকগঞ্জ-কোকরাঝাড়-সরভোগ-আমিনগাঁও, এই লাইন স্বাধীনতা ও দেশভাগ, ও আরো পরবর্তীতে, ভারত-পাক যুদ্ধের ফলস্বরূপ, ছিন্নভিন্ন হয়ে যায়, ও অসমকে বাকি দেশের সাথে যুক্ত করার লক্ষ্যে, ১৯৫০ সালে অসম লিংক প্রোজেক্ট সম্পূর্ণ হয়, এবং সম্পূর্ণ ভিন্ন রুটে অসমকে যুক্ত করা হয়।

(৩) বেঙ্গল ডুয়ার্স রেলওয়ে (BDR) :- এই লাইনের জন্ম হয়, মূলতঃ পশ্চিম ডুয়ার্স অঞ্চল থেকে কলকাতা বন্দরে, চা ও সেগুন কাঠের সরবরাহ করার লক্ষ্যে। তিস্তার পূর্ব পাড়ে, জলপাইগুড়ি শহরের সামান্য দক্ষিণ পূর্বে, বার্নিশ ঘাট থেকে দোমোহনী, লাটাগুড়ি, মালবাজার হয়ে ডামডিম পর্যন্ত ১৮৯৩ সালের ১৫ ই জানুয়ারি, মিটার গেজ রেলপথ চালু হয়। ওই বছরেরই ৩০ শে জুলাই, লাটাগুড়ি থেকে রামশাই পর্যন্ত একটা ব্রাঞ্চ লাইন চালু হয়ে যায়। বর্তমানে এই ব্রাঞ্চ লাইনটা পরিত্যক্ত। এরপর এই রেলপথকে পূর্ব, পশ্চিম ও দক্ষিণে সম্প্রসারিত করা হয়। ১৯০০ সালের মধ্যেই, বার্নিশ ঘাট ও দোমোহনীর মধ্যবর্তী, বার্নিশ জংশন থেক এই রেল সিস্টেমকে দক্ষিণে লালমনিরহাট পর্যন্ত সম্প্রসারিত করে অসম মেন লাইনে যুক্ত করা হয় ১৯০১ সালের মধ্যে, মালবাজার থেকে পূর্বে চালসা, ও ডামডিম থেকে পশ্চিমে ওদলাবাড়ি পর্যন্ত লাইন পেতে ফেলা হয়। ১৯০৩ সালের মধ্যে, চালসা থেকে আরো পূর্ব দিকে, চেঙমারী, দলগাঁও হয়ে রেলপথ পৌঁছয়, তোর্ষা নদীর পশ্চিমে মাদারিহাট অবধি। আর পশ্চিমে ওদলাবাড়ি থেকে রেলপথ এগিয়ে যায়, তিস্তার পূর্ব পাড়ে বাগরাকোট পর্যন্ত। তৎকালীন বাগরাকোট স্টেশনের অবস্থান ছিল বর্তমান স্টেশনের খানিক উত্তরে। ১৯১৮ সালে, চালসা থেকে মেটেলি পর্যন্ত, চা ও পাথর পরিবহনের লক্ষ্যে স্থাপন হয়, একটা ৫.২৩ মাইল দীর্ঘ শাখা রেলপথের।

বিধ্বংসী বন্যার জেরে, BDR-এর একটা বড় অংশ ক্ষতিগ্রস্ত হয়। বার্নিশ ঘাট থেকে দোমোহনী ও বার্নিশ জংশন থেকে সাড়ে-৬১ মাইল পর্যন্ত লাইন বিনষ্ট হওয়ার দরুন, ১৯৩১ সালে পরিত্যক্ত হয় যায়, ও পরিবর্তে, ১৯৩১ সালেই দোমোহনী থেকে সাড়ে-৬১ মাইল পর্যন্ত নতুন লাইন পাতা হয়। ১৯৪১ সালে, BDR সম্পূর্ণভাবে, EBR এর অন্তর্ভুক্ত হয়ে যায়।

(৪) কোচবিহার স্টেট রেলওয়ে (CBSR) :- সারা ভারতের সঙ্গে কোচবিহার রাজ্যের সংযোগ বাড়ানো ও ব্যবসা-বাণিজ্যের শ্রীবৃদ্ধির লক্ষ্যে, কোচবিহারের তৎকালীন রাজা, EBR এর গীতলদহ জংশন থেকে কোচবিহার, আলিপুরদুয়ার হয়ে ভূটান পাহাড়ের গায়ে অবস্থিত, জয়ন্তী ও তার সংলগ্ন পাথরের খনি অঞ্চল পর্যন্ত ন্যারো গেজ লাইন পাতার বন্দোবস্ত করেন। গীতলদহ জংশন থেকে কোচবিহার সদর, খোলতা হয়ে কালজানি নদীর দক্ষিণ পাড় পর্যন্ত এই রেলপথ পড়তো, কোচবিহার রাজার এক্তিয়ারের মধ্যে, কালজানি নদীর উত্তর পাড় থেকে জয়ন্তী পর্যন্ত রেলপথের অংশ ছিল ব্রিটিশ ভারতের অন্তর্ভুক্ত। ১৮৯৩ সাল থেকে ১৯০১ সালের মধ্যবর্তী সময়ে, এই ন্যারোগেজ রেলপথের নির্মাণ করা হয়। পরবর্তী কালে, ১৯১০ সালের মধ্যে এই লাইনকে মিটার গেজে রূপান্তরিত করা হয়। ১৯১২ থেকে ১৯১৪ সালের মধ্যে, রাজাভাতখাওয়া থেকে পশ্চিমে, কালচিনি, হাসিমারা হয়ে দলসিংপাড়া পর্যন্ত রেল পথ সম্প্রসারণ করা হয়। কোচবিহার রাজ্যের সম্পত্তি এই CBSR-এর পরিচালনা করতো EBR।

(৫) দার্জিলিং হিমালয়ান রেলওয়ে (DHR) :- গ্রীষ্মপ্রধান ভারতের তাপক্লিষ্ট ইংরেজ শাসকদের পছন্দের প্রমোদনগরী, তথা তৎকালীন অবস্থায়, অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ প্রশাসনিক কেন্দ্র দার্জিলিংকে, দেশের রেল মানচিত্রে যুক্ত করার লক্ষ্যে, ১৮৮০ সালে শিলিগুড়ি থেকে কার্শিয়াঙ পর্যন্ত রেলপথ চালু করে, প্রথমবার ন্যারোগেজ রেলপথ সহযোগে, পর্বতারোহণের প্রক্রিয়া আরম্ভ হয়। ১৮৮১ সালের মধ্যেই, সোনাদা, ঘুম হয়ে রেলপথ পৌঁছে যায় দার্জিলিং। ১৮৮৫ সালে এই রেলপথকে দার্জিলিং থেকে সামান্য সম্প্রসারিত করা হয় দার্জিলিং বাজার পর্যন্ত, যদিও বর্তমানে এই ছোট্ট সেকশনটা বিলুপ্ত হয়ে গেছে।

১৯১৪-১৯১৫ খৃষ্টাব্দ সময়কালে, DHR সমতলেও লাইন পাতা আরম্ভ করে। অধুনা বিলুপ্ত, পঞ্চনৈ জংশন স্টেশন থেকে মাটিগাড়া, নকশালবাড়ি, তৈয়বপুর, ইসলামপুর-আলুয়াবাড়ি (বর্তমানে আলুয়াবাড়ি রোড জংশন) হয়ে কিষাণগঞ্জে, EBR এর মিটার গেজ নেটওয়ার্ক পর্যন্ত ন্যারোগেজ রেলপথ পরিসেবা আরম্ভ করে দেয়। ওই একই সময়কালে, শিলিগুড়ি থেকে সেবক হয়ে কালিম্পঙ রোগ পর্যন্ত ‘তিস্তা ভ্যালি এক্সটেনশন রেলওয়ে’ নির্মিত হয়। ১৯৫০ সালের ভয়ঙ্কর বন্যায়ে ধ্বংসপ্রাপ্ত, অধুনা বিলুপ্ত এই সেকশনের কোনো অংশই আজ আর দেখা যায় না।

বর্তমানে কিষাণগঞ্জ সেকশন ব্রডগেজ সেকশনে রূপান্তরিত হয়েছে। আর DHR ইউনেস্কো বিশ্ব ঐতিহ্যের মর্যাদা লাভ করেছে।

(৬) কাটিহার-গোদাগাড়ি লাইন :- EBR কর্তৃক এই মিটার গেজ লাইন ১৯০৯ সালে চালু হয়। বর্তমানে এই লাইনের কাটিহার-সিঙ্ঘাবাদ বর্তমানে ভারতের অংশ। বাকি অংশ বাংলাদেশে।

★ স্বাধীনতা-উত্তর পরিস্থিতি :

(১) স্বাধীনতা ও দেশভাগের ফলে, অসম বাকি দেশ থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়। এর ফলে স্বাধীনতার ঠিক পরেই অসম লিংক প্রোজেক্ট অধিগৃহীত হয়। কিষাণগঞ্জ থেকে তৈয়বপুর হয়ে শিলিগুড়ি পর্যন্ত DHR এর ন্যারো গেজ লাইনকে মিটার গেজে রূপান্তরিত করা হয়। এই লাইনকে পঞ্চনৈ জংশনের পরিবর্তে ৩.৫ কিলোমিটার দক্ষিণে, নবগঠিত শিলিগুড়ি জংশনে নিয়ে আসা হয়। পুরনো শিলিগুড়ি স্টেশনের নাম হয় শিলিগুড়ি টাউন, ও তার গুরুত্বও বহুলাংশে খর্ব হয়ে যায়। শিলিগুড়ি টাউন থেকে ওল্ড হিলকার্ট রোডের মধ্যবর্তী প্রায় ৪ কিলোমিটার ন্যারোগেজ রেল লাইনের অ্যালাইনমেন্ট, পশ্চিম দিকে সরিয়ে আনা হয়, শিলিগুড়ি টাউন-শিলিগুড়ি জংশন নতুন মিটারগেজ অ্যালাইনমেন্টের উপর। শিলিগুড়ি-হলদিবাড়ি ব্রডগেজ সেকশনকে মিটার গেজে পরিবর্তন করা হয়। একদা গুরুত্বপূর্ণ এই মেন লাইনের মর্যাদার অবনমন হয়ে, এই লাইন পরিণত হল কম গুরুত্বের ব্রাঞ্চ রেলপথে।

(২) শিলিগুড়ি জংশন থেকে সম্পূর্ণ নতুন অ্যালাইনমেন্টে মিটার গেজ রেলপথ নিয়ে যাওয়া হয় সেবক পর্যন্ত ও তারপর তিস্তা সেতুর উপর দিয়ে সেই রেলপথকে জোড়া হয় বাগরাকোটের নতুন স্টেশনের সাথে। মালবাজারের উত্তরে নতুন নিউ মাল জংশন স্টেশন ও রেলপথ স্থাপন হয়। এরফলে মালবাজারে প্রবেশ না করে, শহরের উত্তর সীমারেখা দিয়ে রেলপথ পেরোনোর বন্দোবস্ত হয়। পশ্চিমে মাদারিহাট থেকে তোর্ষা নদীর অতিক্রম করে, নতুন হাসিমারা স্টেশন (যা পুরনো হাসিমারা স্টেশনের ৩ কিলোমিটার দক্ষিণ পশ্চিমে অবস্থিত) হয়ে CBSR-এর রাজাভাতখাওয়াগামী লাইনের সাথে সংযুক্ত করা হয়। এই সংযোগস্থল থেকে দলসিংপাড়া অবধি রেলপথ বন্ধ করে দেওয়া হয়। দমনপুরের দক্ষিণে আলিপুরদুয়ার জংশন স্থাপন হয় ও এখান থেকে সম্পূর্ণ একটা নতুন মিটার গেজ লাইন, অসমের ফকিরাগ্রাম পর্যন্ত নির্মাণ করা হয়, ও তৎপরবর্তী পুরনো অসম মেন লাইনের সাথে জুড়ে দেওয়া হয়। ২৬ শে জানুয়ারি ১৯৫০, অর্থাৎ ভারতের প্রজাতন্ত্র রাষ্ট্র হওয়ার দিনেই এই নতুন অসম লাইন, জাতির প্রতি সমর্পিত করা হয়। নতুন অসম লাইন, কাটিহার-বারসৈ-কিষেণগঞ্জ-তৈয়বপুর-শিলিগুড়ি জংশন-ডামডিম-নিউ মাল জংশন-মাদারিহাট-আলিপুরদুয়ার জংশন-কামাখ্যাগুড়ি-ফকিরাগ্রাম-বঙাইগাঁও-রঙিয়া-আমিনগাঁও রুটে পর্যবসিত হল।

(৩) কাটিহার-রাধিকাপুর ও কাটিহার সিঙ্ঘাবাদ রেলপথ মিটার গেজ ব্রাঞ্চ রেলপথে পর্যবসিত হল।

(৪) DHR এর শিলিগুড়ি-দার্জিলিং মেন লাইন বর্তমানে ইউনেস্কো বিশ্ব ঐতিহ্যের মর্যাদা লাভ করেছে। ১৯৬০ এর দশকে এই লাইনকে নবগঠিত নিউ জলপাইগুড়ি পর্যন্ত সম্প্রসারিত হয়।

(৫) ১৯৬০ সালে, শিলিগুড়ির দক্ষিণে, জলপাইগুড়ি জেলার সাহুডাঙ্গীর কাছে, নিউ জলপাইগুড়ি জংশন স্টেশন স্থাপিত হয়। নিউ জলপাইগুড়ি থেকে আলুয়াবাড়ি পর্যন্ত সম্পূর্ণভাবে নতুন রুট, তারপর আলুয়াবাড়ি থেকে বারসৈ হয়ে মুকুরিয়া পর্যন্ত মিটার গেজ লাইনের সমান্তরাল অ্যালাইনমেন্ট, তারপর মুকুরিয়া থেকে কুমেদপুর পর্যন্ত নতুন রুটে ব্রডগেজ লাইন চালু হয় ১৯৬৪ সালে।

১৯৫৯ থেকে ১৯৬৩ সময়কালে, গঙ্গাপাড়ের খেজুরিয়া ঘাট থেকে মালদা টাউন হয়ে নিমাসরাই (বর্তমানে ওল্ড মালদা জংশন) পর্যন্ত ব্রড গেজ রেলপথ নির্মিত হয়। ১৯৭১-এ ফারাক্কা বাঁধের উপর রেলপথ চালু হলে, এই লাইন দক্ষিণে নবগঠিত নিউ ফারাক্কা জংশনে বারহাড়ওয়া-আজিমগঞ্জ-কাটোয়া লুপ (BAK Loop) এ সংযুক্ত হয়ে যায়। তবে এর আলোচনা আমরা অন্য কোনোদিন করব।

(৬) নিউ জলপাইগুড়ি থেকে নিউ কোচবিহার হয়ে ব্রড গেজ লাইন অসমের পৌঁছয় ১৯৬০ এর দশকে। এই লাইনের আমবাড়ি-ফালাকাটা থেকে রানিনগর-জলপাইগুড়ি অবধি অংশ, মিটার গেজ থেকে ব্রড গেজ রূপান্তরিত হয়, তারপর শামুকতলা রোড অবধি সম্পূর্ণ নতুন অ্যালাইনমেন্ট, ও শামুকতলা রোডের পর, আলিপুরদুয়ার-ফকিরাগ্রাম-আমিনগাঁও মিটার গেজ লাইনের সমান্তরাল নির্মিত হয়।

বর্তমানে কাটিহার-সিঙ্ঘাবাদ লাইন, কাটিহার-রাধিকাপুর লাইন, কুমেদপুর-নিউ জলপাইগুড়ি লাইন, আলুয়াবাড়ি রোড-বাগডোগরা-শিলিগুড়ি জংশন লাইন, নিউ জলপাইগুড়ি-হলদিবাড়ি লাইন, DHR ও নিউ জলপাইগুড়ি-শিলিগুড়ি জংশন লাইন, উত্তর পূর্ব সীমান্ত রেলওয়ের কাটিহার ডিভিশনের অন্তর্ভুক্ত। আবার শিলিগুড়ি জংশন-মাদারিহাট-আলিপুরদুয়ার জংশন লাইন, (শিলিগুড়ি জংশন বাদে), নিউ জলপাইগুড়ি-নিউ কোচবিহার-নিউ বঙাইগাঁও লাইন (নিউ জলপাইগুড়ি ও নিউ বঙাইগাঁও বাদে), বামনহাট-আলিপুরদুয়ার জংশন লাইন, নিউ মাল জংশন-চ্যাঙড়াবান্ধা লাইন ও ময়নাগুড়ি রোড-নিউ কোচবিহার লাইন উত্তর পূর্ব সীমান্ত রেলওয়ের আলিপুরদুয়ার ডিভিশনের অন্তর্ভুক্ত।

আশা করবো এই প্রবন্ধ, উত্তরবঙ্গের রেল ইতিহাস সম্পর্কে অনেকটাই আলোকপাত করতে সক্ষম হবে।

(বিঃ দ্রঃ :- উপরিউক্ত রেললাইনসমূহ, রেলের টেকনিক্যাল সেকশন অনুযায়ী লেখা হয়নি, পাঠকের সহজবোধ্য হওয়ার মত করে লেখা)।


লেখকঃ- পাভেল ঘোষ (দুর্গাপুর, পশ্চিম বর্ধমান)
[লেখক দুর্গাপুর ওয়াইল্ডলাইফ ইনফরমেশন অ্যান্ড নেচার গাইড সোসাইটির সম্পাদক এবং ওয়াইল্ডলাইফ বায়োলজিস্ট]
তথ্যসূত্রঃ- Indian Railways Administrative Report, 1918, 1930 & 1937 ; Fibiwiki ; Indian Railways/NFR, Government of India

প্রথম প্রকাশঃ- ভূগোলিকা ফেসবুক পেজ, চতুর্থ বর্ষপূর্তি-৩০/০৩/২০২১

©ভূগোলিকা-Bhugolika
©মিশন জিওগ্রাফি ইন্ডিয়া

Content Protection by DMCA.com
এখান থেকে শেয়ার করুন
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  

মন্তব্য করুন

error: মিশন জিওগ্রাফি ইন্ডিয়া কর্তৃক সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত