গার্হস্থ্য জীববৈচিত্র্য (Domesticated Biodiversity)

২০২০ — বিশে বিষ। আজকে শুধু ‘বাংলা বন্ধ’ নয়, ‘ভারত বন্ধ’ নয়, চলছে পুরো ‘বিশ্ব বন্ধ’। লকডাউনে সমাজের সবস্তরের মানুষ আজ গৃহবন্দী। কাউকে জোর করে আটকে রাখা হয়েছে আবার কেউ বা মৃত্যু ভয়ে আটকে আছে চার দেওয়ালে। করোনার কেরামতিতে জীবজন্তু, পশুপাখি অনায়াসে ঘুরে বেড়াচ্ছে সুনসান রাস্তাঘাটে। নেই কোন যান চলাচলের শব্দ, ধোঁয়া, চিৎকার চেঁচামেচি। বইছে বসন্তের নির্মল বাতাস, কচি পাতায় গাছ গুলো সেজে উঠেছে, বসন্তের শিমূল পলাশ আকাশ লাল করে আছে।তবুও কর্মহীন মানুষ আজ আশায় বুক বেঁধে রয়েছে কবে পরিস্থিতি স্বাভাবিক হবে, কবে তারা কর্মে ফিরবে। এমন দিনে সবার লকডাউন থাকলেও চাষিদের ছুটি নেই।কথায় বলে — ‘চাষী লক্ষ জন পুষি’ ; কৃষকরা চাষ না করলে মানুষ খাবে কি??? গ্রাম ও শহর হবে অচল। তাই যেহেতু ‘ভূগোলিকা-Bhugolika’ আমাদের একটা সুযোগ দিয়েছে ভূগোল বিষয়ক কিছু লেখার জন্য সেই সুযোগটা আমি হারাতে চাই না। তৃতীয় বর্ষপূর্তিতে ‘ভূগোলিকা-Bhugolika’ কে শুভেচ্ছা ও ধন্যবাদ জানিয়ে আজ আমি “গার্হস্থ্য জীববৈচিত্র্য” সম্পর্কে লিখছি।

♦গার্হস্থ্য জীববৈচিত্র্যঃ-
গার্হস্থ্য জীববৈচিত্র্য বলতে সেই সকল উদ্ভিদ ও প্রাণীদের বোঝানো হয়, যে গুলোকে গৃহে বা গৃহ পরিবেশের সান্নিধ্যে চাষ বা প্রতিপালন করা হয়। অর্থাৎ মানুষের নিজের তৈরি পরিবেশে বসবাসকারী বা অভিযোজনের মাধ্যমে বেঁচে থাকা বিভিন্ন ধরনের উদ্ভিদ ও প্রাণীর বৈচিত্র্যকে গার্হস্থ্য জীববৈচিত্র্য (Domesticated Biodiversity) বলে। অন্যভাবে বলা যায়, Domesticated Biodiversity হল “The genetic variation existing among the species, breeds, cultivars and individuals of animal, plant and microbial species that have been domesticated, often includes their immediate wild relatives”। এর কয়েকটি উদাহরণ হলো — গ্রামাঞ্চলে অনেক বাড়ির বাগানে আম, জাম, পেয়ারা, কাঁঠাল, সবেদা, জামরুল, কলা, লিচু, নারকেল, পেঁপে প্রভৃতি চাষ করা হয়। এছাড়াও বহু বাড়িতে গৃহপালিত পশু ও প্রাণী –গরু, ছাগল, হাঁস, মুরগি, কুকুর, বিড়াল, খরগোশ, রাজহাঁস, টিয়া, ময়না, কাকাতুয়া, ম্যাকাও, কাঠবিড়ালি ও রঙিন মাছ প্রতিপালন করা হয়।
বর্তমান সময়ে আমাদের কাছে গার্হস্থ্য জীববৈচিত্র্য খুবই গুরুত্বপূর্ণ। কেননা —
(১) খাদ্যের চাহিদা পূরণের জন্যঃ- খাদ্যের চাহিদা পূরণে দানাশস্য হিসেবে ধান, গম, মিলেট প্রভৃতি ; ডালশস্য হিসেবে মুগ, মসুর, বিউলি, ছোলা, মটর প্রভৃতি ; শাকসবজি হিসেবে আলু, পটল, বাঁধাকপি, ফুলকপি, বেগুন, মূলো, পেঁয়াজ, টমেটো প্রভৃতি ; মশলা হিসেবে আদা, রসুন, জিরে, হলুদ, লঙ্কা, ধনে প্রভৃতি ; ফল হিসেবে আম, জাম, কাঁঠাল, কলা, লিচু, নারকেল, সবেদা, পেয়ারা, জামরুল প্রভৃতি চাষ করা হয়। এছাড়াও প্রোটিন জাতীয় খাদ্যের অভাব মেটানোর জন্য মাছ হিসেবে রুই, কাতলা, মৃগেল, চিংড়ি, মাগুর প্রভৃতি ; ডিম ও মাংসের চাহিদা মেটাতে হাঁস, মুরগি, ছাগল প্রভৃতি ; দুগ্ধ ও দুগ্ধজাত দ্রব্যের জন্য গরু, মোষ প্রভৃতি পালন করা হয়।
(২) সৌন্দর্য বৃদ্ধিতেঃ- বাড়ির চারপাশে বিভিন্ন ধরনের বাহারি গাছ ও ফুলের গাছ লাগিয়ে সৌন্দর্যবর্ধন করা হয়। ঝাউ, নানাপ্রকার অর্কিড, নানাপ্রকার ক্যাকটাস, পাতাবাহার, গোলাপ, জুঁই, মল্লিকা, গন্ধরাজ, টগর, ডালিয়া, জিনিয়া, কসমস্, এস্টার, চন্দ্রমল্লিকা, ক্যালেনডুলা, সালভিয়া, সন্ধ্যামণি, অপরাজিতা, জবা, রঙ্গন গাঁদা, রজনীগন্ধা প্রভৃতি উদ্ভিদ উল্লেখযোগ্য।
(৩) শখের প্রাণী পালনঃ- শখে, সামর্থ্যানুযায়ী মানুষ অনেক রকম প্রাণী গৃহে পালন করে থাকে। যেমন — পাখি হিসেবে টিয়া, ময়না, কাকাতুয়া, ম্যাকাও, পায়রা প্রভৃতি ; জীবজন্তু হিসেবে কুকুর, বিড়াল, খরগোশ প্রভৃতি।
(৪) বাস্তুতান্ত্রিক ভারসাম্য রক্ষায়ঃ- বাস্তুতন্ত্রের ভারসাম্য বজায় রাখার জন্য অনেকসময় নির্দিষ্ট প্রাণী প্রতিপালন করা হয়। যেমন — তৃণ ও ঝোপঝাড়ের নৈকট্যে আগাছা দমনে ছাগল, ভেড়া প্রভৃতি ; ইঁদুর নিধনে বিড়াল ; পুকুরের বাস্তুতান্ত্রিক স্বাস্থ্য বজায় রাখতে হাঁস প্রতিপালন করা হয়।
(৫) নতুন প্রজাতির উদ্ভবঃ- বিভিন্ন জাতের শস্য ও প্রাণীদের ভিন্ন ভিন্ন পরিবেশে চাষ ও প্রতিপালন করার ফলে অভিযোজন ঘটে ও নতুন প্রজাতির উদ্ভব ঘটে। অনেক সময় মানুষ নিজ চাহিদা মেটাতে সংকর প্রজাতি তৈরি করে। যেমন — উচ্চফলনশীল বিভিন্ন প্রকার ধানবীজ।
(৬) ভেষজ উদ্ভিদের জোগানঃ- তুলসী, নিম, বাসক, কালমেঘ, সর্পগন্ধা প্রভৃতি ভেষজ উদ্ভিদ বাড়ির আনাচে কানাচে চাষ করা হয়, যা আয়ুর্বেদ চিকিৎসায় কাজে লাগে।

♦উদ্ভিদ ও প্রাণীর গার্হস্থ্যকরণ সম্পর্কিত কিছু তথ্যঃ-
(১) মানব কর্তৃক সর্বপ্রথম যে মেরুদণ্ডী প্রাণীটির গার্হস্থ্যকরণ হয়েছিল, তা হল — কুকুর।
(২) প্রায় ১২ হাজার বছর আগে প্রাচীন মানুষ উদ্ভিদের গার্হস্থ্যকরণ শুরু করেছিল।
(৩) বর্তমানে পাখিদের মধ্যে সর্বপ্রধান গৃহপালিত প্রজাতি হল মুরগি।
(৪) উল্লেখযোগ্য দুই অমেরুদণ্ডী প্রাণী যাদের গার্হস্থ্যকরণ হয়েছে, তারা হল — মৌমাছি ও রেশমকীট।
(৫) প্রাচীন মানুষ ৫০০০-১০০০০ খ্রীস্টপূর্বাব্দ সময়কালে গরু, ছাগল, ভেড়া, শূকর, বিড়াল, মুরগি, গাধা প্রভৃতি প্রাণীর গার্হস্থ্যকরণ করেছিল।

গার্হস্থ্য জীববৈচিত্র্য আমাদের জীবনে অধিকাংশ ক্ষেত্রে, বিশেষত গ্রামীণ উন্নয়নে সুফল প্রদান করলেও, কিছু কিছু ক্ষেত্রে এর বিরূপ প্রভাব দেখা যাচ্ছে। যেমন — (১) অনেকসময় গার্হস্থ্য উদ্ভিদ প্রজাতির দাপটে স্বাভাবিক উদ্ভিদ প্রজাতির বৃদ্ধি ও বিকাশ ব্যাহত হয়। (২) বাণিজ্যিক স্বার্থে আরও লাভবান হতে মাছ, মুরগি প্রভৃতি চাষে/পালনে মানব স্বাস্থ্যের জন্য ক্ষতিকর সামগ্রী ব্যবহার প্রভৃতি।

লেখিকাঃ- দিপালী তুং (মোহাড়, সবং, পশ্চিম মেদিনীপুর)
তথ্যসূত্রঃ- Environmental Science ; Wikipedia ; A Handbook on Domesticated Plants & Animals ; Global Biodiversity Assessment/UNEP

প্রথম প্রকাশঃ ভূগোলিকা ফেসবুক পেজ, তৃতীয় বর্ষপূর্তি-৩০/০৩/২০২০

©ভূগোলিকা-Bhugolika
©মিশন জিওগ্রাফি ইন্ডিয়া

Content Protection by DMCA.com
এখান থেকে শেয়ার করুন
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  

দিপালী তুং

ঠিকানাঃ মোহাড়, সবং, পশ্চিম মেদিনীপুর

মন্তব্য করুন

error: মিশন জিওগ্রাফি ইন্ডিয়া কর্তৃক সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত