ত্রিনিতি সাইউ এবং মেঘালয়ে হলুদ-বিপ্লব

হলুদ বিপ্লব

উত্তর-পূর্ব ভারতের পাহাড়ি রাজ্য মেঘালয়ের পশ্চিম জয়ন্তিয়া পাহাড় জেলার লাসকেইন ব্লকের মুলিয়েহ্ গ্রাম। এই গ্রামেরই এক বাসিন্দা হলেন ত্রিনিতি সাইউ, যিনি একাধারে একজন প্রাক্তন স্কুল শিক্ষিকা এবং মেঘালয়ে সাম্প্রতিক হলুদ-বিপ্লবের জননী। হলুদ বিপ্লব বলতে আমরা কৃষিক্ষেত্রে তৈলবীজের উৎপাদন বৃদ্ধিকে চিহ্নিত করি। কিন্তু এ বিপ্লব হলুদ (Turmeric) এর এক প্রজাতির জৈব চাষ ও মহিলাদের অধিক আয় এবং আর্থিক স্বশক্তিকরণের কাহিনী। জয়ন্তিয়া উপজাতির মাতৃতান্ত্রিক সমাজের এক অখ্যাত প্রতিনিধির জাতীয় প্রেক্ষাপটে পরিচিত হওয়ার কাহিনী।

মেঘালয়ের জয়ন্তিয়া পাহাড়ে হলুদ চাষ নতুন নয়। সময়টা ২০০৩ সাল। ত্রিনিতি সাইউ চাষ করলেন হলুদের এক প্রজাতি, যার নাম ল্যাকাডং (Lakadong)। এই ল্যাকাডং হলুদে কারকিউমিনের পরিমাণ থাকে ৬-৭.৫%। এর পূর্বে এ অঞ্চলে সাধারনত যে প্রজাতির হলুদ চাষ করা হত, তা হল ল্যাচেন (Lachein)। এই প্রজাতির হলুদে কারকিউমিনের পরিমাণ থাকে ১-৩%। তাই অধিক পরিমাণ কারকিউমিনের কারণে ল্যাকাডং হলুদের চাহিদা ও বাজারমূল্য অনেক বেশি। কারকিউমিন কি? এর গুরুত্ব কি? কারকিউমিন হল হলুদের একটি প্রধান উপাদান, যা হলুদের বর্ণ ও স্বাদ নির্ধারক। এই কারকিউমিন যৌগ হল একপ্রকার অ্যান্টি অক্সিডেন্ট। আয়ুর্বেদ বিশেষজ্ঞরা একে ‘ম্যাজিক যৌগ’ বলেন। ভিটামিন ই বা ভিটামিন সি-র তুলনায় পাঁচ থেকে আট গুণ বেশি কার্যকরী অ্যান্টিঅক্সিড্যান্ট কারকিউমিন শরীরের প্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়ায়, কোলেস্টেরলের মাত্রা নিয়ন্ত্রণ করে। এছাড়া আর্থ্রাইটিস, অ্যাজমা, হার্টের রোগ, অ্যালঝাইমার, ডায়াবেটিস, আলসারেটিভ কোলাইটিস প্রভৃতি রোগ প্রতিরোধী। এমনকি ক্যানসার কোষের বাড়বাড়ন্ত থামিয়ে দিতে পারে এই কারকিউমিন। তাই, অধিক মাত্রায় কারকিউমিনের কারণে ল্যাকাডং বর্তমানে হলুদের অন্যতম শ্রেষ্ঠ প্রজাতি রূপে বিবেচিত হয়।

সেবছর ল্যাকাডং হলুদ চাষ করে ত্রিনিতি দেখলেন এই প্রজাতির হলুদ চাষ করে দ্বিগুণ আয় হয়েছে। এরপরই শুরু হল লড়াই। নিজের গ্রাম মুলিয়েহ্ ছাড়াও আশেপাশের মদনকিনসয়, মিঙ্কটুং, রটিয়াং, পিনটেই প্রভৃতি গ্রামের মহিলাদের বোঝাতে শুরু করলেন ল্যাকাডং হলুদ চাষের মাধ্যমে কিভাবে আর্থিক স্বনির্ভরতা লাভ করে উন্নততর জীবন গড়ে তোলা সম্ভব। একেবারে গোড়ার দিকে মাত্র ২৫ জন মহিলা নিয়ে এই নতুন হলুদের চাষ শুরু করলেও, ধীরে ধীরে স্থানীয় মহিলারা এই চাষে আকর্ষিত হন। বর্তমানে প্রায় ১০০ টি স্বনির্ভর গোষ্ঠীর মাধ্যমে ৮০০ জনেরও বেশি মহিলা এই হলুদ-বিপ্লবে যুক্ত হয়েছেন। আর ত্রিনিতি সবাইকে শিখিয়েছেন জৈব পদ্ধতিতে ল্যাকাডং হলুদ চাষের খুঁটিনাটি। ল্যাকাডং হলুদ চাষ করে মহিলাদের আয় বৃদ্ধি হয়েছে ২ থেকে ৩ গুণ। সাইউ-এর নেতৃত্বে এই স্বনির্ভর গোষ্ঠীগুলি মহিলা পরিচালিত দুটি সমবায় সমিতিও তৈরি করেছে। আর সাইউ-এর সাফল্যের পর মেঘালয়ের কৃষি মন্ত্রক সাইউ-এর নেতৃত্বে ‘মিশন ল্যাকাডং’ (২০১৮-২০২৩) কর্মসূচী গ্রহণ করেছে, যার লক্ষ্য হল বার্ষিক ৫০ মেট্রিক টন হলুদ উৎপাদন। উল্লেখ্য, ২০১৫-১৬ বর্ষে মেঘালয়ে মোট ২৫১৬ হেক্টর জমিতে হলুদের চাষ হয়েছিল এবং মোট উৎপাদনের পরিমাণ ছিল ১৬ মেট্রিক টন, যার মধ্যে ৯ মেট্রিক টন ল্যাকাডং হলুদ।

সাফল্যের পর সম্মান পেতেও দেরি হয়নি। ২০১৮ সালে ভারত সরকারের কৃষি মন্ত্রক তাঁকে ‘Excellence in Horticulture’ সম্মান প্রদান করে। ২০২০ সালে ভারত সরকার তাঁকে ‘অন্যান্য (জৈব কৃষি)’ শ্রেণীতে পদ্মশ্রী সম্মানে ভূষিত করে। আজ তিনি ‘হলুদ ত্রিনিতি’ (Turmeric Trinity) নামে পরিচিত। জৈব কৃষির সম্প্রসারণ, কৃষিতে আয় বৃদ্ধি, মহিলাদের আর্থিক স্বনির্ভরতা প্রদান — একই বিপ্লবে অনেককিছু সুনিশ্চিত করেছেন ত্রিনিতি। ৬ সন্তানের জননী, একজন উপজাতি মহিলা কৃষকের এই কৃতিত্বে সারা দেশ গর্বিত। নিঃসন্দেহে, ত্রিনিতি সেই একজন, যাঁর কাছ থেকে গ্রামীণ, কৃষিভিত্তিক ভারত অনুপ্রাণিত হয়ে উন্নতির পথে এগোতে পারে।


লেখকঃ- অরিজিৎ সিংহ মহাপাত্র (পার্শ্বলা, বাঁকুড়া)
[লেখক সহযোগী সম্পাদক, মিশন জিওগ্রাফি ইন্ডিয়া]

তথ্যসূত্রঃ- NDTV ; Scroll ; Department of Agriculture – Government of Meghalaya ; Feminism in India ; Sentinel Assam ; She The People TV ; The North Eastern Today ; First Post

প্রথম প্রকাশঃ- ভূগোলিকা ফেসবুক পেজ, চতুর্থ বর্ষপূর্তি-৩০/০৩/২০২১

©ভূগোলিকা-Bhugolika
©মিশন জিওগ্রাফি ইন্ডিয়া

Content Protection by DMCA.com
এখান থেকে শেয়ার করুন
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  

মন্তব্য করুন

error: মিশন জিওগ্রাফি ইন্ডিয়া কর্তৃক সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত