বৃহস্পতির দুই চাঁদ : গ্যানিমিড ও ইউরোপা

গ্যানিমিড ও ইউরোপা

বৃহস্পতি! সূর্য থেকে দূরত্ব অনুসারে পঞ্চম এই গ্রহই হল আমাদের সৌরজগৎ-এর বৃহত্তম গ্রহ। এই গ্রহের একটি-দুটি নয়, ৭৯ টি উপগ্রহ রয়েছে। উপগ্রহের সংখ্যায় আমাদের সৌরজগৎ-এ বৃহস্পতির স্থান দ্বিতীয়, শনি (৮২ টি) প্রথম। যদিও, ৭৯ টি উপগ্রহের মধ্যে ৪ টি গ্যালিলিয়ান উপগ্রহই প্রধান। যাদের মধ্যে রয়েছে গ্যানিমিড এবং ইউরোপা।

গ্যানিমিড শুধুমাত্র বৃহস্পতির বৃহত্তম উপগ্রহ নয়, এটি আমাদের সৌরজগৎ -এর সবচেয়ে বড়ো চাঁদ। ১৬১০ সালের ৭ই জানুয়ারি, গ্যালিলিও সর্বপ্রথম গ্যানিমিড সহ বৃহস্পতির গ্যালিলিয়ান উপগ্রহগুলি পর্যবেক্ষণ করেন এবং ১৫ ই জানুয়ারি, ১৬১০ তিনি এই সিদ্ধান্তে উপনীত হন যে, এইগুলি বৃহস্পতিকে প্রদক্ষিণকারী বস্তু (উপগ্রহ)। জার্মান জ্যোতির্বিদ সাইমন মরিয়াস প্রদত্ত নাম ‘গ্যানিমিড’ (গ্রিক পৌরাণিক চরিত্র গ্যানিমিডের নামানুসারে) দ্বারাই এই উপগ্রহটি গ্যানিমিড নামে পরিচিত হয়। গ্যানিমিড আবার বৃহস্পতি-৩ নামেও পরিচিত। গ্যানিমিড ১০,৭০,৪০০ কিমি দূরত্বে বৃহস্পতিকে প্রদক্ষিণ করে এবং প্রতি সাত দিন ও তিন ঘন্টায় একটি আবর্তন সম্পন্ন করে। গ্যানিমিড বৃহস্পতির সাথে জোয়ারীবদ্ধ থাকে, যার একপাশ সর্বদা গ্রহের দিকে মুখ করে থাকে। গ্যানিমিডের ব্যাস ৫,২৬৮ কিলোমিটার।

পায়োনিয়ার-১০, পায়োনিয়ার-১১, ভয়েজার-১, ভয়েজার-২, গ্যালিলিও, জুনো, নিউ হরাইজনস্ প্রভৃতি মহাকাশযান গ্যানিমিডকে পর্যবেক্ষণ করেছে। এসমস্ত পর্যবেক্ষণ থেকে প্রাপ্ত তথ্যগুলি হল, গ্যানিমিডের গড় ঘনত্ব ১.৯৩৬ গ্রাম/ঘনসেমি, এটি প্রায় সমান অংশের পাথুরে উপাদান এবং বেশিরভাগ জল-বরফের একটি সংমিশ্রণ গঠিত।গ্যানিমিডের শিলার সঠিক গঠন এখনও জানা যায়নি, তবে সম্ভবত এল/এল এল শ্রেনীর সাধারণ কনড্রাইটের মতো গঠন বলে অনুমান করা হয়। গ্যানিমিড একমাত্র চাঁদ, যার একটি চৌম্বকীয় ক্ষেত্র আছে বলে জানা গেছে।

অভ্যন্তরীণ গঠন অনুসারে গ্যানিমিডের তিনটি স্তর রয়েছে : লৌহ-সালফাইড কেন্দ্রমন্ডল, সিলিকেট গুরুমন্ডল এবং বরফ ও জলের সংমিশ্রণে ভূপৃষ্ঠ। ১৯৭০ এর দশকেই নাসার বিজ্ঞানীরা অনুমান করেছিলেন যে, গ্যানিমিডের দুই বরফের স্তরের (ভূপৃষ্ঠস্থ বরফের স্তর এবং পাথুরে গুরুমন্ডলের ওপরের বরফের স্তর) মধ্যবর্তী অংশে জল দ্বারা গঠিত এক পুরু মহাসাগর রয়েছে। ১৯৯০ এর দশকে গ্যালিলিও মহাকাশযানও গ্যানিমিড পর্যবেক্ষণ করে উপপৃষ্ঠীয় মহাসাগরেরর উপস্থিতির সংকেত দিয়েছিল। ২০১৪ সালে প্রকাশিত এক বিশ্লেষণ অনুসারে, গ্যানিমিডের ভূপৃষ্ঠটি পর্যায়ক্রমে একাধিক বরফ ও মহাসাগরের স্তর দ্বারা গঠিত, যা একেবারে গুরুমন্ডল পর্যন্ত বিস্তৃত। ২০১৫ সালের মার্চ মাসে হাবল স্পেস টেলিস্কোপ পরিমাপকৃত তথ্য দ্বারা বিজ্ঞানীরা জানান, গ্যানিমিডের মেরুজ্যোতির সরণ দ্বারাই নিশ্চিত হওয়া যায় এই উপগ্রহে একটি উপপৃষ্ঠীয় মহাসাগর রয়েছে। বিজ্ঞানীরা মনে করেন, গ্যানিমিডে লবণাক্ত জলের এক সুবৃহৎ মহাসাগর রয়েছে, যা গ্যানিমিডের চৌম্বকীয় ক্ষেত্র ও মেরুজ্যোতিকে প্রভাবিত করতে সক্ষম।

ইউরোপা হল আমাদের সৌরজগৎ-এর ষষ্ঠ বৃহত্তম উপগ্রহ। শীতল ও জমাট এই উপগ্রহটি বৃহস্পতির অন্যতম বড় চাঁদ। ১৬১০ সালের ৭ ই জানুয়ারী গ্যালিলিও সর্বপ্রথম ইউরোপা সহ বৃহস্পতির প্রধান ৪ টি উপগ্রহকে পর্যবেক্ষণ করেন এবং ১৬১০ সালের ৮ ই জানুয়ারী পৃথকভাবে ইউরোপাকে পর্যবেক্ষণ করেন। জার্মান জ্যোতির্বিদ সাইমন মরিয়াস গ্রিক পুরাণের চরিত্র ইউরোপার নামে এই উপগ্রহের নামকরণের প্রস্তাব করেন এবং যা থেকেই এটি ইউরোপা নামে পরিচিত হয়। বৃহস্পতি থেকে ইউরোপার দূরত্ব ৬,৭০,৯০০ কিমি। প্রায় সাড়ে তিনদিনে বৃহস্পতিকে একবার প্রদক্ষিণ করে থাকে।

সৌরজগতের গ্রহ উপগ্রহের মধ্যে ইউরোপার ভূমিতল হচ্ছে সবচেয়ে মসৃণ। জমাট বরফে (যার মধ্যে সালফিউরিক অ্যাসিডও জমে আছে) ঢাকা এই চাঁদে লম্বা লম্বা কাটাকুটির ছকের মত দাগ দেখতে পাওয়া যায়। কিন্তু এতে খনিত স্থান বা গর্ত নেই বললেই চলে। ইউরোপা ব্যাসে প্রায় ৩,১৩৮ কিলোমিটারের, আমাদের চাঁদের থেকে ছোট। চারিদিকে শুধু জল আর জল। নাসার দাবি যত সমুদ্র আর যত অতলান্ত মহাসাগর রয়েছে পৃথিবীতে তার অনেক অনেক গুণ বেশি সমুদ্র আর মহাসাগরে ভেসে রয়েছে বৃহস্পতির এই চাঁদ। এমনকি প্রশান্ত মহাসাগরের চেয়েও অন্তত ১০০ গুণ বেশি গভীর মহাসাগর রয়েছে বৃহস্পতির ইউরোপায়, আর এই তরল জলের মহাসাগর গুলি ঢাকা রয়েছে পুরু বরফের চাদরে। ২০১৭ সালে নাসা প্রেরিত ‘গ্যালিলিও’ মহাকাশযান থেকে পাঠানো চিত্র থেকে ইউরোপে সম্পর্কে রহস্যময় তথ্য আবিষ্কৃত হয়েছিল। তা হল, ইউরোপার উপরিভাগে এক ধরনের ফ্র্যাকচার বা ফাটল। যা সৌরজগতের অন্য কোন উপগ্রহে নেই বলে মনে করেছেন মহাকাশ বিজ্ঞানীরা। আশ্চর্যের বিষয় হল, এগুলো অত্যন্ত ক্ষণস্থায়ী। মাঝে মাঝেই দেখা যায় আবার হঠাৎ করেই মিলিয়ে যায়। আবার নতুন জায়গা দিয়ে ফাটল গজিয়ে ওঠে। হাজার হাজার ফাটলগুলো দেখতে অনেকটা হাইওয়ে রাস্তার মত। যা হাজার হাজার মাইল জুড়ে বিস্তৃত। এর প্রস্থ কখনও কখনও ৭০ কিমি পর্যন্ত। কোনো কোনো ফাটল তিনটি অংশে বিভক্ত। দুটো কালো লাইন আর‌ একটি সাদা লাইন। কি কারনে এই ফাইলগুলো গজিয়ে উঠছে আবার হঠাৎই মিলিয়ে যাচ্ছে তার কোনো সুনির্দিষ্ট কারণ জ্যোতির্বিজ্ঞানীরা তখনও নির্ণয় করতে পারেননি। সেই সময় নাসার বিজ্ঞানীরা মনে করেন জলই হল এই ফাটলের আধার।

ইউরোপার ভূপৃষ্ঠের ১০০ কিমি নিচে রয়েছে এই জল।যা মাঝে মাঝে উত্তপ্ত হয়ে বরফ ফেটে উপরের দিকে বেরিয়ে আসে। ফলে উপরিস্তরের বরফের আবৃত সবকিছুই পরিবর্তিত হয়ে নতুন আকার ধারণ করে। কিন্তু প্রশ্ন হল, যেখানে তাপমাত্রা শূন্যের প্রায় ১৪০ ডিগ্রি নিচে সেখানে কিভাবে তরল জলের আধার থাকা সম্ভব? আর তা কিভাবে গরম হয়ে এ ফাটলের সৃষ্টি করে?তবে এর ব্যাখ্যা প্রসঙ্গে জ্যোতির্বিজ্ঞানীরা বলেছেন বিশাল গ্রহ বৃহস্পতির টাইডাল ফোর্স আর এর অন্যান্য উপগ্রহের মিলিত আকর্ষণের ফলে ইউরোপার অভ্যন্তরে অত্যন্ত তাপ উৎপন্ন হয়ে ফাটলের সৃষ্টি করে। কিন্তু বিজ্ঞানীদের এই যুক্তি যে কতটা গ্রহণযোগ্য তা নিয়ে এখনও প্রশ্ন রয়েছে।বিজ্ঞানীদের ধারণা ছিল কোন মহাকাশযানে সাহায্যে ইউরোপার খুব কাছ থেকে অথবা এর বায়ুমণ্ডলের ভিতরে ঢুকে চিত্রগ্রহণ করে পরীক্ষা নিরীক্ষা করেই জানা যাবে যে এই রহস্যময় ফাটলের গঠন এবং মিলিয়ে যাওয়ার আসল কারণ কি? তবে ফাটল নিয়ে গবেষণা থেমে থাকেনি। শুরু হয়েছিল ছবি বিশ্লেষণ। ‘গ্যালিলিও’ প্রেরিত সেই ছবি তিন বছর ধরে খতিয়ে দেখে ইউরোপায় তরল জলের সুবিশাল অস্তিত্ব সম্পর্কে নিশ্চিত হওয়া গেছে।

ইউরোপার সমুদ্রটি রয়েছে তার উপপৃষ্ঠে অর্থাৎ ভূপৃষ্ঠের অল্প নিচেই। বিজ্ঞানীদের আরও অনুমান, জল সমৃদ্ধ একাধিক খনিজ রয়েছে এই উপগ্রহে। তার থেকেই হয়তো জলের সৃষ্টি। অনেকেই দাবি করেছেন, উপগ্রহের পৃষ্ঠে উপস্থিত তেজস্ক্রিয় পদার্থ গুলির বিকিরণে যে উত্তাপ তৈরি হয়েছিল, তাতে হয়তো ওই জল সমৃদ্ধ খনিজগুলো থেকে জল বেরিয়ে আসে। এভাবেই হয়তো বহু সময়কাল আগে তৈরি হয়েছিল সমুদ্র। এখন সেটি লুকিয়ে রয়েছে মোটা বরফের নিচে। এই বরফের চাদর দেখেই মহাকাশ বিজ্ঞানীদের নজরে পড়েছিল ইউরোপা। নাসার বিজ্ঞানীদের দাবি যখন সমুদ্রটি তৈরি হয়েছিল, তখন এটি নিশ্চিত ভাবেই বসবাসের যোগ্যই ছিল। তবে এখন ইউরোপার জলে নাকি কার্বন-ডাই-অক্সাইডের পরিমাণ বেশি। তাই যে সমস্ত জীবের পক্ষে কার্বন ডাই অক্সাইডের সাহায্যে জীবনধারণ করা সম্ভব তারা এখানে থাকলেও থাকতে পারে। তাহলে কি সেখানে সবুজ উদ্ভিদ রয়েছে? যদি থাকে, তাহলে তো সেখান থেকেই অক্সিজেনের মাত্রাও বাতাসে বাড়তে পারে। মনে করা হচ্ছে ইউরোপার সাগরের জল প্রাণের অনুকূল হলেও হতে পারে। যেসব মাইক্রোবসের জীবনধারণের জন্য কার্বন-ডাই-অক্সাইড অনুকূল তাদের অস্তিত্ব অতীতে থাকতেই পারে। তবে এখন সেটির অবস্থা কি, সে সম্পর্কে বিশদ তথ্য প্রমাণ এখনও পাওয়া যায়নি। তবে একথা অনস্বীকার্য, পৃথিবীর বহু গুণ বেশি জলরাশি নিয়ে ইউরোপার ভূপৃষ্ঠের ৬৫ থেকে ১৬০ কিলোমিটার গভীর এলাকা রহস্যে টইটম্বুর। তবে মানুষের বাসযোগ্য কি না ইউরোপা, এ প্রশ্নের উত্তর মিলতে এখনও ঢের দেরি। কারণ মানুষের বসবাসের অনুকূল পরিবেশ তৈরি আছে কি না তা বুঝতে শুধু জলের উপস্থিতি নয়, আরো অনেকগুলি অনুকূল বিষয়ে প্রয়োজন।


লেখকঃ- টুবাই ঘোষ (ঘোড়াডাঙ্গা, পূর্ব বর্ধমান)
[লেখক মুর্শিদাবাদের পাটিকাবাড়ি হাইস্কুলের শিক্ষক]
তথ্যসূত্রঃ- উইকিপিডিয়া ; সাপ্তাহিক বর্তমান ; দ্য ওয়াল ; ন্যাশনাল জিওগ্রাফিক ; এনসাইক্লোপিডিয়া ব্রিটানিকা

প্রথম প্রকাশঃ- ভূগোলিকা ফেসবুক পেজ, চতুর্থ বর্ষপূর্তি-৩০/০৩/২০২১

©ভূগোলিকা-Bhugolika
©মিশন জিওগ্রাফি ইন্ডিয়া

Content Protection by DMCA.com
এখান থেকে শেয়ার করুন
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  

মন্তব্য করুন

error: মিশন জিওগ্রাফি ইন্ডিয়া কর্তৃক সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত